কম ঘুমে বাড়ে
হার্টের অসুখের সম্ভাবনা
প্রীতিময় রায়বর্মন
খাওয়াদাওয়া, খেলাধুলো বা নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ রাখতে আরেকটা জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হল ঘুম। অনেকেই এখন ব্যালেন্স ডায়েট ফলো করছেন, নিয়ম করে শারীরিক কসরত–ও করছেন, কিন্তু ঘুমোচ্ছেন মাত্র ৪–৫ ঘণ্টা। এই কম ঘুমই ডেকে আনছে হার্টের সমস্যা।
কম ঘুমে হার্টের বারোটা...
✦ হার্টের অসুখের অন্যতম প্রধান রিস্ক ফ্যাক্টর হাই ব্লাডপ্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ। কম ঘুমোলে বাড়ে রক্তচাপ। যাঁরা ৫–৬ ঘণ্টা বা ৫ ঘণ্টার কম ঘুমোন, তাঁদের রক্তচাপ বাড়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছেন চিকিৎসকরা। ২৯ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের কম ঘুম তাঁদের রক্তচাপ বাড়ার সম্ভাবনাকে দ্বিগুণ করে তোলে।
✦ গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে ৫ ঘণ্টার কম ঘুম হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাকে প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে দেয়।
✦ কম ঘুমে রক্তে হাই–সেন্সেটিভ সি–রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিনের (hs-cRP) পরিমাণ বাড়ে। আর তাতে দেখা দেয় হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা।
✦ শুধুমাত্র একটি বিনিদ্র রাত শরীরে বাড়িয়ে দেয় ইন্টারলিউকিন–৬, টিউমার নেক্রোসিস ফ্যাক্টর–আলফা এবং সি–রিঅ্যাকটিভ প্রোটিনের মতো ক্ষতিকর টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ। আর যা থেকে ক্যান্সার, আর্থারাইটিস এবং হার্টের অসুখের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।
✦ রাতে ৫ ঘণ্টার কম ঘুম হার্টের অসুখের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয় ৩৯%। আর ৫ ঘণ্টার বেশি, কিন্তু ৬ ঘণ্টার কম ঘুমে হার্টের অসুখের সম্ভাবনা ১৮% বেড়ে যায়।
✦ এ ছাড়া কম ঘুমোলে বাড়ে স্ট্রেস, ডিপ্রেশন। কেউ কেউ হয়ে ওঠেন খিটখিটে বা অল্পতে হয়ে যান বিরক্ত। দেখা দেয় মনোসংযোগের অভাব, ক্লান্তি। কমে কর্মদক্ষতা। কমে যায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। আর এ সবের প্রভাব পড়ে আমাদের শরীরে। সরাসরি না হলেও যা পরোক্ষভাবে ডেকে আনে হার্টের সমস্যা।
বেশি কাজ, কম ঘুম! ফল মারাত্মক...
ব্যালেন্স ডায়েট থেকে নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা সবই করছেন। কিন্তু কখনওই ঠিক সময় পরিমিত ঘুমাচ্ছেন না, আর এই না ঘুমই হার্টের অসুখের অন্যতম প্রধান কারণ। আমাদের এখানে এখন অনেক পেশার কর্মীরাই ঘুমের সময় কমিয়ে কাজের সময় বাড়িয়েছেন। কিছুদিন হয়ত তাঁরা এভাবে কাজ করে যেতে পারবেন। কিন্তু কম ঘুমিয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ শরীরে কাজ করে যাওয়া সম্ভব নয়। শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে বাধ্য। ফলে কাজের গুণগতমান যেমন খারাপ হবে, তেমনই কমবে হিউম্যান রিসোর্সও।
সুস্থ থাকতে কতটা ঘুম...
হার্টকে সুস্থ রাখতে এবং অন্যান্য সমস্যাকে এড়িয়ে শরীরকে সুস্থ রাখতে পরিমিত ঘুমের প্রয়োজন। আমেরিকার ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বয়স্কদের ৭–৮ ঘণ্টা, ২৬–৬৪ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৮–২৫ বছর বয়সী তরুণদের ৭–৯ ঘণ্টা এবং ১৪–১৭ বছর বয়সী কিশোরদের ৮–১০ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। এ ছাড়া শিশুদেরও সুস্থ শরীরের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের দরকার। ৩ মাস পর্যন্ত শিশুর ঘুমের দরকার ১৪–১৮ ঘণ্টা, ৪–১১ মাস ১২–১৫ ঘণ্টা, ১–২ বছর ১১–১৪ ঘণ্টা, ৩–৫ বছর ১০–১৩ ঘণ্টা এবং ৬–১৩ বছর ৯–১১ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন।
ভালো ঘুমের জন্য...
✔ দিনের বেলায় ঘুমবেন না।
✔ রাতে ঘুম পেলে তবেই বিছানায় শুতে যান।
✔ সন্ধের পর চা, কফি, ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি এড়িয়ে চলুন।
✔ ঠান্ডা লাগার ধাত না থাকলে, সম্ভব হলে শুতে যাওয়ার আগে স্নান করতে পারেন।
✔ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোরকম ওষুধ খাবেন না।
✔ বই পড়তে ভালো লাগলে ঘুমোনোর আগে বই পড়ুন, গান ভালবাসলে গানও শুনতে পারেন।
✔ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সন্ধের পর বা ঘুমোনোর কিছুক্ষণ আগে ঠান্ডা জল, গ্রিন টি, ঠান্ডা দুধ, কলা ইত্যাদি অল্প পরিমাণে খেলে তা ভালো ঘুমের সহায়ক।
✔ প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরচর্চা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম, সাঁতার কাটা, হাঁটা ইত্যাদি করুন এবং নিজেকে সব সময় অ্যাক্টিভ রাখার চেষ্টা করুন।
✔ এখন অনেকেই রাত পর্যন্ত টিভি দেখেন, কম্পিউটারে কাজ বা মোবাইলে চ্যাট বা বিভিন্ন খেলাকে অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন। আজকের দিনে ঘুম না হওয়ার অন্যতম কারণ এই ইলেকট্রনিক সরঞ্জামে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। তাই ভালো ঘুমের জন্য শুতে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে থেকেই এগুলো থেকে বিরত থাকুন। অফ রাখুন আপনার স্মার্ট ফোন।
✔ সম্ভব হলে প্রতিদিন ঘুমানোর আর ঘুম থেকে ওঠার নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
মনে রাখুন...
কম ঘুমনো মানুষের সংখ্যা আজকের দিনে খুব একটা কম নয়। প্রতিটা মানুষের জীবনেই ঘুম অপরিহার্য। অতিরিক্ত ঘুম যেমন ভালো নয়, তেমনই কম ঘুমও ভালো নয়। প্রতিটা মানুষের, বিশেষ করে যাঁরা কর্মক্ষেত্রে সারাটা দিন ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের রাতে অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমের দরকার। কারণ ঘুমের সঙ্গে আমাদের শরীরের প্রতিটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকলাপের যোগ রয়েছে। আর এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গের একটি হৃৎপিণ্ড। এর ধুকপুক যতক্ষণ, ততক্ষণই প্রাণ। এই ধুকপুককে ঠিক রেখে নিজেকে সুস্থ রাখতে দরকার পরিমিত ঘুম। কারণ কম ঘুম মানেই যে মহাবিপদের সূত্রপাত!
সব ছবি: আন্তর্জাল
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments