ফার্স্ট ওয়েভের তুলনায় সেকেন্ড ওয়েভে বাচ্চারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কেন? আর থার্ড ওয়েভে নাকি বাচ্চারাই বেশি আক্রান্ত হবে?
ছোটো বাচ্চারা প্রথম ওয়েভ থেকেই স্কুল বন্ধের ফলে বাড়িতেই আছে। কিন্তু, তাদের অধিকাংশ বাবা–মা’‌ই কর্মসূত্রে বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছেন। ফলে বাচ্চাদের প্রথম ওয়েভে অসুস্থ হওয়ার হার বেশ কম ছিল। এছাড়া, শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীর শ্লেষ্মা কোষের বহিরভাগের যে রিসেপ্টরের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস কোষে প্রবেশ করে সেই ACE–2 রিসেপ্টর শিশুদের শরীরে গড়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় নেয়। ফলে শিশুদের শরীরে করোনা ভাইরাসের প্রবেশে কিছুটা বাধা থাকে।
শিশুদের রক্তে সাধারণত লিম্ফোসাইট নামক শ্বেত রক্ত কণিকার ভাগ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি থাকে। এরাই প্রধানত স্থায়ী ইমিউনিটির লড়াইয়ে মুখ্য ভূমিকা নেয়। রোগীর অবস্থা কতটা খারাপ, সেটা নির্ণয়ের একটা রাস্তা হল এনএলআর বা নিউট্রফিল লিম্ফোসাইট রেশিও। এটা ৩.২ এর বেশি বা লিম্ফোসাইটপেনিয়া থাকলে রোগীর অবস্থা সঙ্কটজনক। সুতরাং শিশুদের একটু হলেও প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে।
প্রধানত, শিশুরা আক্রান্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেইভাবে হাসপাতালে ভর্তি করার অবস্থায় তারা যায় না। বাড়িতেই তাদের চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে।
কিন্তু, বাড়ির বড়োদের কোভিড টিকাকরণের পরবর্তী সময়ে, বাচ্চাদের শরীরে ভাইরাসের প্রবেশের সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে গেছে। কারণ তারা ভ্যাক্সিনেটেড নয়।
ছোটোদের মধ্যে সঠিকভাবে মাস্ক পরা, মাস্ক হাইজিন বজায় রাখা, ক্রমাগত মুখে চোখে হাত না দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়া, এই অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা খুব কঠিন। ফলে ওদের ইনফেকটেড হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
এইসব নানাবিধ কারণের সমন্বয়ে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ওয়েভে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই যত দ্রুত সম্ভব ওদের টিকাকরণ দরকার।


বাচ্চাদের কী কী উপসর্গ দেখা যাচ্ছে?‌ বড়দের থেকে কী আলাদা কোনও উপসর্গ?
করোনার উপসর্গ মোটামুটি বয়স নির্বিশেষে একই। অর্থাৎ জ্বর, ডায়েরিয়া, পেটে ব্যথা, সর্দি–কাশি, বমি, মাথার যন্ত্রণা, গন্ধ এবং স্বাদ চলে যাওয়া, দুর্বলতা।
তবে ছোটদের ক্ষেত্রে কনজাংটিভাইটিস, কানে ব্যথা, গায়ে র‌্যাশ বেরনো— এ ধরণের কিছু অতিরিক্ত উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যার মধ্যে পোস্ট কোভিড কাওয়াসাকি লাইক সিনড্রোম বা মাল্টি অর্গ্যান ইনফ্ল্যামেটোরি সিনড্রোম (MIS–C) হতে পারে সাধারণত পাঁচ বছরের নিচের বাচ্চাদের। এক্ষেত্রে সারা গায়ে র‌্যাশ, লসিকা গ্রন্থি বড়ো হয়ে যাওয়া, জ্বর ইত্যাদি থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একে একে শরীরের সব অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ফেলিওরে যেতে পারে। দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা এর নিরাময়ের একমাত্র উপায়।

করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর বাচ্চাদের কি কোনও শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে?
সুস্থ হয়ে ওঠার পরে দুর্বলতা সকলেরই থাকে। কিন্তু, কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে MIS–C দেখা দিলে অবস্থা সঙ্কটজনক হতে পারে।

বাচ্চাদের জন্য আলাদা কি কোনও চিকিৎসা রয়েছে?‌
বাচ্চাদের চিকিৎসা পুরোটাই শারীরিক সমস্যা নির্ভর। তাদের ক্ষেত্রে আইভারমেকটিন, ডক্সিসাইক্লিন জাতীয় ওষুধ দেওয়া যায় না। ভিটামিন সি, ডি, বি কমপ্লেক্স, জিঙ্ক, বিটাডিন গার্গেল, ভেপার ইনহেলেশন, এইগুলোই চিকিৎসা।

করোনা প্রতিরোধে বাচ্চাদের কী কী সাবধানতা অবলম্বন দরকার?‌
করোনা প্রতিরোধে প্রচলিত প্রক্রিয়াগুলোই করতে হবে, অর্থাৎ ক্রমাগত হাত ধোয়া, মাস্ক সঠিকভাবে পরা ইত্যাদি। বাচ্চাদের দু’‌বছর বয়সের উপর থেকেই মাস্ক ব্যবহার শুরু করতে হবে। পাশাপাশি প্রচুর জল খাওয়া, হালকা শ্বাসের ব্যায়াম, প্রাণায়াম, বাড়িতেই ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করা। ভিডিও কলে বন্ধুদের সঙ্গে একটু গল্পগুজব, বাবা–মায়ের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো। গঠনমূলক কাজ যেমন গান, বাজনা, আঁকা, আবৃত্তি, লেখালেখিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, মন ভালো রাখা।



অনেকেই বাচ্চাকে ইমিউনিটি বুস্টআপ রেডিমেট ফুড খাওয়াচ্ছেন। এতে কি সত্যিই ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে?‌
না, কোনওরকম বাজার চলতি ইমিউনিটি বুস্ট করার ওষুধ লাগবে না। মরসুমি ফল, শাক–সবজি, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট, সুষম আহার, পরিমাণ মত জল ওরাল ডিহাইড্রেশন সল্ট, মাছ, মাংস, ডিম খেলেই বাচ্চারা সুস্থ থাকবে। সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম।

বাচ্চাদের ভ্যাকসিনেশন কবে নাগাদ সম্ভব?
এই নিয়ে ইতিমধ্যে ট্রায়াল শুরু হয়ে গেছে। আশা করা যায় মাস কয়েকের মধ্যেই ছোটদের (১২ থেকে ১৮ এবং বারোর নিচে) ভ্যাকসিন বাজারে চলে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *