হাঁটার কোনো বিকল্প নেই
প্রীতিময় রায়বর্মন

শরীরকে তরতাজা রাখতে কে না চান? এর জন্য আ‌য়োজনের কোনো খামতি নেই। স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকরকম শারীরিক কসরত ছাড়াই নিয়মিত হাঁটলেই শরীরকে দিব্যি সুস্থ-সবল রাখা যায়। চিকিৎসকও প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলছেন, সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকতে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। সুস্থ থাকতে হলে হাঁটতেই হবে। আর হাঁটা তো সবচেয়ে সহজ ব্যায়াম। যেটা যে কোনো বয়সে যে কেউই করতে পারেন। তবে হাঁটা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন আমাদের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘােরাফেরা করে। হাঁটার জন্য আদর্শ সময় কোনটা? কতক্ষণ হাঁটব? খুব জোরে হাঁটলে তবেই কি সেটা উপকারি? চলুন হাঁটি-হাঁটি পায়ে-পায়ে বেরিয়ে পড়ি হাঁটার বিজ্ঞানসম্মত উপকার ও মনের মধ্যে আঁকিবুকি কাটা নানা প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে

কখন হাঁটবেন? কতক্ষণ হাঁটবেন? 
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সকাল বা বিকেলের মনোরম পরিবেশই হাঁটার জন্য আদর্শ। কারও মতে, হাঁটার জন্য সবচেয়ে ভালো সময় বিকেল। তবে যখনই হাঁটুন প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটুন। আর রোজ হাঁটতে অনীহা? সপ্তাহে ৫ দিন ৩০ মিনিট করে অর্থাৎ ১৫০ মিনিট হাঁটাই শরীরকে চাঙ্গা রাখার পক্ষে যথেষ্ট। সহজ কথায় বলতে গেলে, সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটা জরুরি। শরীর দিলে ৩০ মিনিটের বেশিও হাঁটতে পারেন। তবে কখনওই ৩০ মিনিটের কম সময় হাঁটা উচিত নয়। শারীরিক কোনো সমস্যার কারণে যদি একবারে ৩০ মিনিট হাঁটতে না পারেন, তাহলে ১০ মিনিট বা ২০ মিনিট হেঁটে একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটুন। এভাবে দু-একবার বিশ্রাম নিয়ে ৩০ মিনিট হাঁটুন। হার্ট বা শরীরের ক্রনিক কোনো অসুখ বা বয়স একটু বেশি হলে হাঁটার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 

ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে বেরোবেন? 
অনেকেরই ধারণা, সকালে ঘুম থেকে উঠে হাঁটাই সব থেকে স্বাস্থ্যকর। সত্যিই কি তাই? অনেকে আবার সকালে হেঁটে এসে ঘুমিয়ে পড়েন। চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ঘুম থেকে উঠেই হাঁটতে না যাওয়াই ভাল। ঘুম থেকে ওঠার কমপক্ষে ৩০ মিনিট পর হাঁটতে বেরোন। যাঁরা সন্ধে বা রাতে হাঁটেন তাঁরা ঘুমােনার কমপক্ষে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে হেঁটে ফিরুন। হেঁটে এসেই ঘুমােনা উচিত নয়। 

খাওয়ার আগে না পরে? 
অনেকে ভাবেন, খাওয়ার আগে হাঁটলে খিদে ভালো হবে। আবার কারও ধারণা, খাওয়া শেষে হাঁটা হজম সহায়ক। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, খাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বা খাওয়া শেষ হওয়ার পরেই হাঁটা উচিত নয়। অনেকেই আছেন, যাঁরা সকাল, বিকেল এবং সন্ধেতে— তিন সময়ই হাঁটেন। তাঁরা তিন বেলাই খাওয়ার কিছুক্ষণ পর ১০ মিনিট করে হাঁটতেই পারেন। এতে শরীরের বেশ উপকারই হয়। ডায়াবেটিস ও রক্তচাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই ১০ মিনিট করে হাঁটা খুবই কার্যকরী। 

হাঁটার গতি 
খুব জোরে, মাঝারি না ধীর গতিতে হাঁটা স্বাস্থ্যকর? চিকিৎসকদের পরামর্শ, মাঝারি গতিতেই হাঁটুন। অনেকে দু-তিনজনের দল করে হাঁটতে বেরোন। এতে হাঁটাও হয়, আবার একটু গল্পও হয়। তবে হাঁটার সময় গল্প করতে গিয়ে কখনওই হাঁটার গতিকে খুব কমিয়ে ফেলবেন না। এতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। 

উপকারের নেই শেষ....
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদয়কে সুস্থ রাখতে হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও বলছে, নিয়মিত হাঁটলে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। তাদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাঁরা প্রতিদিন ৩০ করে মিনিট হাঁটেন, তাঁদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে, যাঁরা নিয়মিত হাঁটেন না তাদের তুলনায়। ফলে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমে। হাঁটলে হার্টের অসুখের অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর স্থূলতার ঝুঁকির পাশাপাশি কমে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং বাড়ে ভালো কোলেস্টেরল পরিমাণ। হাঁটলে যেহেতু রক্ত সঞ্চালন ঠিক থাকে, ফলে আর্টারি ব্লক হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। ফলে সুস্থ হৃদয়ের জন্য হাঁটা খুব জরুরি।
হার্টকে সুস্থ রাখার মতো ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও হাঁটার কোনো বিকল্প নেই। রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে হাঁটা অত্যন্ত প্র‌য়োজনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, হাঁটলে টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমে।

☛ সকাল বা বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া আর স্নিগ্ধ পরিবেশে হাঁটলে শরীর ও মন সতেজ থাকে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার এক সমীক্ষা রিপাের্টে দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটলে একাকিত্বের অনুভূতি বা স্ট্রেস থেকে নিজেকে দূরে রাখা সম্ভব। ফলে ভালো থাকে মানসিক স্বাস্থ্য। তাদের সমীক্ষায় প্রায় ৮৩% মানুষ জানিয়েছেন, হাঁটাকে নিয়মিত অভ্যেসে পরিণত করার ফলে তাঁদের মেজাজ-মর্জি অনেকটাই ভাল হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটলে ৬০% পর্যন্ত কোলন ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।
☛ ওজন কমাতে হলে নাকি প্রতিদিন ৬০০ ক্যালরি কমানো দরকার। আর এই ক্যালরি বার্ন করার সবচেয়ে ভাল ব্যায়াম হাঁটা। শরীরের ওজন ৬০ কেজি হলে তিনি যদি প্রতিদিন ঘণ্টায় ২ মাইল গতিতে ৩০ মিনিট হাঁটেন, তাহলে ৭৫ ক্যালরি বার্ন হয়। ঘণ্টায় ৩ মাইল গতিতে হাঁটলে ৯৯ ক্যালরি এবং ঘণ্টায় ৪ মাইল গতিতে হাঁটলে ক্যালরি বার্নের পরিমাণ প্রায় ১৫০।

দেহের পেশি সচল ও প্রাণবন্ত রাখতে হাঁটার জুড়ি মেলা ভার। বয়স বাড়লেই কোমর বা হাঁটুর ব্যথায় ভোগেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হাঁটলে পা ও পায়ের আঙুলের পাশাপাশি কোমর এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গেরও ব্যায়াম হয়। ফলে উপশম হয় সন্ধিস্থলের ব্যথারও।
☛ খেয়াল রাখুন হাঁটার সময় যাতে দু’হাত সমান তালে চলে। তাহলে একইসঙ্গে হাতের প্রতিটি সন্ধিস্থল, ঘাড় ও কাঁধের ব্যায়ামও হয়ে যাবে। ব্যাকপেইনের সমস্যাতেও হাঁটা দারুণ ওষুধ।
শরীরে ভিটামিন ‘ডি’-র পরিমাণ কম থাকলে আর্থারাইটিসের সম্ভাবনা বাড়ে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ‘ডি’ খাওয়ার পাশাপাশি সকালে কিছুক্ষণ সূর্যালোকে হাঁটাই যায়। সূর্যের আলো থেকে আমাদের ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরি হয়, যা আর্থারাইটিসকে আটকাতে বিশেষভাবে কার্যকর। 

☛ বয়স বাড়লে কমে স্মৃতিশক্তি। সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, ৬৫ বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে প্রতি ১৪ জনের মধ্যে একজন স্মৃতিশক্তি হারান। আর ৮০ বা তার বেশি বয়সিদের ৬ জনের মধ্যে একজনের স্মৃতি নষ্ট হয়। নিয়মিত বিভিন্ন ব্যায়ামে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল ঠিক রাখতে পারলে স্মৃতি হারানোর সম্ভাবনা প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব বয়স্ক মানুষ সপ্তাহে অন্তত ৬ মাইল হাঁটেন, তাঁরা খুব একটা স্মৃতিশক্তি হারান না। 
প্রেগন্যান্ট অবস্থায় সাঁতার ছাড়া আরেকটি ভাল ব্যায়াম হল হাঁটা। এ সময় মুক্ত বাতাসে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। তবে কতক্ষণ হাঁটবেন তা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে।

সব ছবি:‌ আন্তর্জাল 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *