শুরু সেই প্রস্তর যুগে

প্রীতিময় রায়বর্মন‌‌

একটা ভাইরাস কীভাবে মানবসভ্যতার চলার পথকে থমকে দিতে পারে তা দেখিয়ে দিল কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস। অতিমারী, মহামরী বারে বারে হানা দিয়েছে দুনিয়ায়। কেড়েছে অগুণিত প্রাণ। একটা সময় আমাদের ধারণা ছিল এই মহামারীর সূত্রপাত প্লেগের হাত ধরে প্রায় ৩০০০ বছর আগে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথম মহামারী প্লেগ দেখা দিয়েছিল সেই প্রস্তর যুগে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের মাইক্রোবায়োলজিস্ট মারিয়া স্পাইরউয় যেমনটা বললেন, আমাদের ধারণা ছিল, প্লেগ খুব বেশি হলে ৩০০০ বছরের পুরোনো। কিন্তু প্যালিওজিনোমিক্সের গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রায় ৫০০০ বছর আগে প্রস্তর যুগেই প্রথম হদিশ মেলে প্লেগের ব্যাক্টিরিয়া বা জীবাণুর। সেই সময়কার এক পাটি দাঁতের জীবাশ্মের ডি এন এ পরীক্ষায় প্লেগের ব্যাক্টিরিয়ার সন্ধান পান গবেষকরা। প্যালিওজিনোমিক্স হল বিজ্ঞানের একটি শাখা, যাঁদের কাজ বিলুপ্ত প্রজাতির জীবাশ্ম থেকে ডি এন এ সংগ্রহ করে পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে সেই সময়কার নানা অজানা তথ্য খুঁজে বের করা। 


ভাইরাস, জীবাণুরা যে যুগে যুগে তাঁদের চরিত্র বদলায় তার প্রমাণও রয়েছে এই গবেষণায়। সমগ্র ইউরোপে ত্রাস সৃষ্টিকারী ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌–এ প্লেগের জীবাণুর সঙ্গে প্রস্তর যুগে প্লেগের জীবাণু চরিত্রগতভাবে কিছুটা আলাদা। ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌–এ জীবাণু ছড়িয়ে ছিল ইঁদুরের মাধ্যমে। আর প্রস্তর যুগে এই রোগ ছড়ানো প্রসঙ্গে গবেষক সিমোন রাসমুসেন বলেন, প্রস্তর যুগে এক–একটি বড় বসতিতে প্রায় হাজার দশেক মানুষ একসঙ্গে থাকতেন। পশুর সঙ্গে ছিল তাঁদের সহাবস্থান। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা একেবারে ছিল না বললেই চলে। ফলে খুব সহজেই ছড়িয়ে ছিল প্লেগ। 
এরপর বারে বারে হানা দিয়েছে প্লেগ। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে গ্রীক–স্পার্টানদের যুদ্ধের মাঝে হানা মহামরী প্লেগ— ‘দি প্লেগ অফ এথেন্স’। অল্প ক’‌দিনের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য। অধিকাংশ ইতিহাসবিদদের মতে এই মহামারী ছড়িয়েছিল গুটিবসন্ত থেকেই। ভেরিওলা ভাইরাসের মাধ্যমে। প্লেগ সে সময় কেড়েছিল এথেন্সের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের প্রাণ। এরপর ৫৪০–৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে‌ প্লেগের হানা কনস্টান্টিনোপলে। শক্তিশালী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে মিশরে ভয়ঙ্কর রূপ নেয় প্লেগ। এবার প্লেগ ছড়াল ইঁদুরের মাধ্যমে। সেই সময় মিশরই জোগাত সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যশস্যের জোগান। আর এর ফলে বর্তমান ইস্তাম্বুল (‌তৎকালিন বাইজান্টাইনের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল)‌ থেকে খুব সহজেই সংক্রামক ব্যধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়ার দেশে দেশে। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ প্রাণ হারাতেন। প্লেগ এতটাই ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছিল যে তা ইউরোপে ‘‌ডার্ক এজ’‌–এর সূচনা করেছিল। প্রায় ৫০ বছর তার করাল গ্রাসে প্রাণ যায় আড়াই কোটি মানু্ষের। যদিও কারও মতে সংখ্যাটা ১০ কোটি।


এবার ১৩৩৪ সাল। প্লেগ ছড়াল চীন থেকে। ইতালির ফ্লোরেন্সে মাত্র ৬ মাসে প্লেগ কাড়ল প্রায় ৯০ হাজার মানুষের প্রাণ। সমগ্র ইউরোপে ‘‌গ্রেট প্লেগ অফ লন্ডন’–এ মৃত্যু হয় প্রায় আড়াই কোটি মানুষের। 
১৩৪৬ সালে ভয়ঙ্কর রূপে ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌ নামে প্লেগের আগমন। কৃষ্ণ সাগর বা ব্ল্যাক সি উপকূলবর্তী অঞ্চল ছিল এবারের প্লেগের এপিসেন্টার। তাই নাম হয় ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌। সে সময় ইউরোপ, এশিয়ার দেশগুলোতে বাণিজ্যের অন্যতম পথ ছিল ব্ল্যাক সি। খাদ্যদ্রব্যে ঠাসা জাহাজগুলো ছিল হাজার হাজার ইঁদুরের বাসস্থান। ফলে সহজেই ইউরোপ, এশিয়ার দেশে দেশে ছড়িয়ে যায় প্লেগ। পরবর্তী ৫ বছরে ‘ব্ল্যাক ডেথ’ ইউরোপে প্রাণ নিল দুই কোটি মানুষের। যা তখনকার ইউরোপের জনসংখ্যার প্রায় এক–তৃতীয়াংশ। ১৩৪৮–এর মাঝামাঝি প্লেগ পৌঁছয় প্যারিস, বোর্দো, লিয়ন ও লন্ডনে। ১৩৪৭–৫১, এই সময়ই ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌ নিয়েছিল সর্বাগ্রাসী রূপ। ইউরোপের প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ মানুষের প্রাণ নিয়েও ক্ষান্ত হয়নি ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌। পরবর্তী প্রায় ২০০ বছর প্লেগ কেড়ে নেয় অন্তত ১০ কোটি মানুষের প্রাণ। পরবর্তী কয়েক প্রজন্মকে বয়ে বেড়াতে হয় ‘‌ব্ল্যাক ডেথ’‌–এর ক্ষত। 

১৮৬০ সালে আবার প্লেগ প্যানডেমিক, এবারও এপিসেন্টার সেই চীন। ছোট্ট গ্রাম ইউয়ানে প্রথম প্লেগ আক্রান্তের হদিশ মেলে। তারপর তা ছড়ায় হংকং, গুয়াংঝু প্রদেশে। আর এই হংকং, গুয়াংঝুর সঙ্গে ভারত, আফ্রিকা, ইকুয়েডর, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি দেশের ছিল সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক। ফলে প্লেগ ছড়ায় ওইসব দেশে। প্রায় দুই দশক দাপিয়ে চলা প্লেগ মহামারীতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। কারও মতে সংখ্যাটা দেড় কোটির বেশি। ১৮৯০–এর দশকে নিরন্তন গবেষণার হাত ধরে এল মারণঘাতি প্লেগের ভ্যাকসিন। 


১৯১০ সালে আবার তার প্রাদুর্ভাব। চীনের মাঞ্চুরিয়ায় দু’‌বছরে প্লেগে মারা গেলেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। তবে এবার চীনের গণ্ডীর মধ্যেই আটকানো গেল প্লেগকে।
১৮৯৮ থেকে ১৯০৮ ভারতে মহামারীর আকার নেয় প্লেগ। ১৮৯৮–এর এপ্রিলে বাংলায় হানা প্লেগের। ১৭ এপ্রিল কাপালিটোলা লেনের এক বাসিন্দার প্লেগে প্রথম মৃত্যু হয়। দ্রুত সংক্রমণ ছড়ায় বেনিয়াপুকুর, কুমারটুলি, শ্যামপুকুর, বড়বাজারে। ৩০ এপ্রিল প্রশাসনিক ঘোষণা, কলকাতায় প্লেগ ‌মহামারীর‌ আকার নিয়েছে। 
গুটি বসন্তও কম ভোগায়নি মানবসভ্যতাকে। একটা সময় গুটি বসন্তে ১০ জন আক্রান্তের ৩ জনই মারা যেতেন। বেশ কয়েক শতক ইউরোপ ও এশিয়ায় গণ্ডীতে দাপটের পর অন্য মহাদেশেও গুটি গুটি পায়ে হানা দেয় গুটি বসন্ত। মেক্সিকো ও আমেরিকায় লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ কাড়ে এই অসুখ। প্রায় এক শতাব্দীতে মেক্সিকো ও আমেরিকায় ৯০–৯৫% আদিবাসী জনগোষ্ঠী মারা যায় এই অসুখে। 
মহামারীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ১৫০ বছরে সাতবার ফিরে ফিরে এসেছে কলেরা মহামারী। প্রথম কলেরা মহামারীর রূপ নেয় ১৮১৭ সালে রাশিয়ায়। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সেনাদের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায় ভারতে এবং প্রাণ যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের। শুধু ভারতই নয় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে ছিল চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, আমেরিকা, ইতালি, স্পেন এবং জার্মানিতে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ। ১৯ শতকের প্রথমভাগ থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত কলেরার গ্রাসে ব্রিটেনে প্রাণ যায় বহু মানুষের।    


১৮৭৫, এবার অতিমারীর আকার নিল হাম বা ফিজির মিজল। এই রোগও ছড়াল ব্রিটিশদের মাধ্যমে। ১৮৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরকারী একটি ব্রিটিশ দল ফিজি আসে ফিজিকে তাঁদের সাম্রাজ্যভুক্ত করার কাজে। তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ফিজির উপজাতি প্রধান ও স্থানীয় প্রশাসকরা। ব্রিটিশদের থেকে রোগের জীবাণু ঢোকে তাঁদের শরীরে। এরপর তাঁদের থেকে দ্রুত রোগটি ছড়ায় সমগ্র দ্বীপে। মৃত্যু হয় প্রায় ৪০ হাজার মানুষের। টিকা আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মানবজাতিকে ভুগিয়েছে মিজল। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময় আবিষ্কার হল এই রোগের টিকা।
নাম বদলে বারে বারে কাহিল করছে ফ্লু। কখনও রাশিয়ান ফ্লু তো কখনও আবার স্প্যানিশ ফ্লু। ১৮৮৯ সালে সাইবেরিয়া ও কাজাকিস্তানে দেখা দেয় রাশিয়ান ফ্লু। পরে ফিনল্যাল্ড, পোল্যান্ড হয়ে ছড়ায় ইউরোপে। এক বছরের মধ্যে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকাতেও অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৮৯০–এর শেষে দিকে প্রায় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ মারা যান এই ফ্লুতে। ১৯১৮ সালে ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ায় হানা অ্যাভিয়ান ফ্লু–র। ওই বছরেরই বসন্তে মাদ্রিদে হানা। নাম হল স্প্যানিশ ফ্লু। ১৯৫৭ সালে এশিয়ান ফ্লু নাম নিয়ে হংকং–এ অনুপ্রবেশ। চীন হয়ে পাড়ি আমেরিকায়। ব্রিটেনে মাত্র ৬ মাসে ফ্লু–তে প্রাণ যায় ১৪ হাজার মানুষের।
২০০৩ সালে চীন থেকে প্রায় ২৬টি দেশে ছড়িয়েছিল সার্স। আক্রান্ত হন ৮,০৯৬ জন এবং মৃত্যু হয় ৭৭৪ জনের। বেশির ভাগ মৃত্যুই হয় পূর্ব ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায়। তখন চিকিৎসক বিজ্ঞানের গবেষকরা বলেছিলেন, এটা একটা সঙ্কেত। এই মহামারী সামলানোর অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে কাজে লাগিয়ে অনেকটাই সফল হওয়া গিয়েছিল সোয়াইন ফ্লু, ইবোলা, জিকা ইত্যাদি প্রতিরোধে। 
এবার ২০০৯। মেক্সিকোতে হদিশ মেলে এইচ ১ এন ১ ভাইরাসবাহিত রোগ সোয়াইন ফ্লু–র। একবছরে সারাবিশ্বে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এই ভাইরাসের ছোবলে। ১৯১৮ ও ১৯৬৮ সাল নাগাদও এইধরনের ভাইরাস হানা দিয়েছিল বিশ্বে।


আর এখন সারাবিশ্বে দাপট দেখাচ্ছে কোভিড–১৯ বা করোনা ভাইরাস। ২০১৯–এর ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের একটি প্রজাতির সংক্রামণের সন্ধান মেলে। ২০২০–এর ৮ নভেম্বর পর্যন্ত সারাবিশ্বে কোভিড–১৯–এ আক্রান্ত হয়েছেন ৪,৮৬,২৫,০৮৪ জন। মৃত্যু হয়েছে ১২,৩২,৫১৬ জনের। ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫,০৭,৭৫৪। সুস্থ ৭৮,৬৮, ৯৬৮ (‌৯২.‌৪৯%‌)‌ জন। মৃত্যু হয়েছে ১,২৬,১২১ জনের। বিভেদ নেই ধনী–দরিদ্রের, উন্নত–অনুন্নতের, রাষ্ট্রনায়ক থেকে সাধারণ মানুষ কেউই বাদ যাচ্ছেন না কোভিড–১৯ বা করোনার থাবা থেকে। সারা বিশ্বের চিকিৎসা গবেষণাকেন্দ্রের গবেষকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কোভিড–১৯–এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের। 


ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে কোনো বিপর্যয়ই পারেনি মানবজাতিকে হারাতে। সে প্রাকৃতির দুর্যোগই হোক বা মহামারীরই হোক বা বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসাত্বকরূপ। হয়ত সাময়িকভাবে ফেলেছে সমস্যায়। কিন্তু সব প্রতিকুলতাতেই পরাজিত করে স্বমহিমায় ঘুরে দাড়িয়েছি আমরা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সাহায্য করেছে একের পর এক ভয়ঙ্কর অসুখে বাই বাই বলতে। আশা, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের হাত ধরে আর সচেতনতায় ভর করে আমরা হারাবই করোনাকেও। ‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *