আজ ২৮ জুলাই, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। আজকের দিনেই হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–এর আবিষ্কর্তা ও নোবেলজয়ী চিকিৎসক–বিজ্ঞানী ডাঃ ব্লুমবার্গ–এর জন্মদিন। ১৯৬৫ সালে তিনি এক অস্ট্রেলীয় উপজাতির মধ্যে হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–এর জীবাণুকে খুঁজে পান। তাই এর আরেক নাম ‘অস্ট্রেলিয়া অ্যান্টিজেন’। ১৯৭৬ সালে ডাঃ ব্লুমবার্গ পান নোবেল পুরষ্কার। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়ে আসছে। তখন দিনটা ছিল ১৯ মে। এরপর ২০১০ সালে ডাঃ ব্লুমবার্গের জন্মদিন ও তাঁর আবিষ্কারকে স্মরণে রাখতে ২৮ জুলাই বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দিনটি পালনের উদ্দেশ্য ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনা বাড়ানো এবং নিজেদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলা। ২০১৭ সালে থিম ছিল ‘এলিমিনেট হেপাটাইটিস’ (নো হেপ) অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ভাইরাল হেপাটাইটিস দূর করার শপথ। গত দু’‌বছরের থিম ছিল ‘হেপাটাইটিস ক্যান নট‌ ওয়েট’‌। আর এবারের থিম ‘‌উই আর নট ওয়েটিং’‌। অর্থাৎ‌ দ্রুত রোগ নির্ণয়, দ্রুত চিকিৎসা এবং অসুখটা যাতে একজনের থেকে আরেকজনের মধ্যে না ছড়ায় তার চেষ্টা করা। মনে রাখবেন— ‘‌ওয়ান লাইফ, ওয়ান লিভার।’‌


নীরব ঘাতক
তাই জরুরি আগাম সর্তকতা

অধ্যাপক ডাঃ কিংশুক দাস
সিনিয়র গ্যাস্ট্রো–এন্টেরোলজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট ও ইন্টারভেনশনাল এন্ডোস্কোপিস্ট
অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল, কলকাতা
ফ্যাকাল্টি, এনবিইএমএস, ডিএনবি (‌গ্যাস্ট্রো–এন্টেরোলজি)‌
অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল টিউটর, এএইচইআরএফ
‘‌ইকোনমিক্স টাইমস ইনস্পায়ারিং গ্যাস্ট্রো–এন্টেরোলজিস্ট’‌স অফ ইন্ডিয়া ২০২৩’‌ পুরস্কার প্রাপ্ত
সভাপতি, ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ গ্যাস্ট্রো–এন্টেরোলজি (‌পশ্চিমবঙ্গ চ্যাপ্টার, ২০২১–২৩)

হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌সি’‌ কতটা মারত্মক?
ডাঃ দাস:‌ এগুলো লিভারের দীর্ঘস্থায়ী অসুখ। বলা যায় ‘‌সাইলেন্ট কিলার’‌ বা ‘‌নীরব ঘাতক’‌। কারণ ভাইরাল হেপাটাইটিস থেকে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এমনকী মৃত্যুও হতে পারে। যা হতে সাধারণত ২০–৩০ বছর সময় লাগে। তবে হেপাটাইটিস ‘‌এ’‌ এবং ‘‌ই’‌ ক্ষণস্থায়ী এবং খুব একটা শারীরিক ক্ষতি করে না। সারা বিশ্বে ২ বিলিয়ান মানুষ কোনও না কোনও সময় হেপাটাইটি ‘‌বি’‌–র শিকার হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌–র তথ্য বলছে, এই মূহূর্তে বিশ্বে ২৫৭ মিলিয়ান মানুষ ভুগছেন হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌, আর ‘‌সি’‌–তে আক্রান্ত ৭১ মিলিয়ান। ভারতে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৪ জন হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–তে আক্রান্ত। ৪ জনের মধ্যে ৩ জনই এই রোগের বাহক। এঁদের থেকেই ছড়ায় রোগ। ভারতে প্রতি ১০০ জনে ১ জন হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–তে আক্রান্ত।
প্রতি ১০ সেকেন্ডে সারা বিশ্বে নতুন করে ১ জন হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌সি’–তে আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ প্রতিবছর ৩ মিলিয়ানেরও বেশি মানুষ নতুন করে এই রোগের শিকার। প্রতি ৩০ সেকেন্ডে বিশ্বে ১ জন মারা যাচ্ছেন ভাইরাল হেপাটাইটিসে। প্রতিদিন প্রায় ৪,০০০ মানুষের মৃত্যুর কারণ ভাইরাল হেপাটাইটিস এবং হেপাটাইটিস সংক্রান্ত অন্যান্য রোগের জটিলতা। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১.‌৩৪ মিলিয়ান মানুষের মৃত্যুর কারণ হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌সি’‌‌। 
মুশকিল হল হেপাটাইটিসের কোনও উপসর্গ থাকে না। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে অসুখ নির্ণয় খুব একটা সহজ নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অ্যাডভান্স স্টেজে রোগ ধরা পড়ে। হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–এর ক্ষেত্রে মাত্র ১০%‌ এবং হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–র ক্ষেত্রে মধ্যে মাত্র ২০%‌ রোগী জানেন তিনি এই অসুখে আক্রান্ত।    
তবে এসব পরিসংখ্যান দেখে ভয় পাবেন না। কারণ ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ সংক্রমণ হলে ৯৫ জনের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একে শরীর থেকে দূর করতে সক্ষম। আর বাকি ৫ জনের এটি ক্রনিক অসুখ হিসেবে থেকে যায়। এঁদের মধ্যে ১ জন সিরোসিসের শিকার হতে পারেন। সেই অর্থে হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ মারণব্যাধি না হলেও এইচআইভি–র থেকে মারাত্মক। তাই সঠিক সময় এর ভ্যাকসিন নেওয়া আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খুব জরুরি। অন্যদিকে হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–তে একবার আক্রান্ত হলে ৩০–৫০%‌ মানুষের এটি ক্রনিক অসুখ হিসেবে থেকে যায়। তবে হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–র কোনও ভ্যাকসিন না থাকলেও ২০২৩–এ ওষুধের মাধ্যমে ৩ মাসের মধ্যে একে নির্মূল করা সম্ভব। ভারতেও এখন হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–র ওষুধ সহজলভ্য।

কীভাবে রোগ ছড়ায়?
ডাঃ দাস:‌ জল ও দূষিত খাবার থেকে হেপাটাইটিস ‘‌এ’‌ এবং ‘‌ই’‌–র ভাইরাস ছড়ায়। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার অভাবে মূলত এতে আক্রান্ত হতে হয়। এই বর্ষায় খাবার জলের পাইপ ও পয়ঃপ্রণালী মিশে গেলে সেখান থেকেও এর জীবাণু ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌সি’‌ মায়ের থেকে শিশুর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মায়ের শরীরে এই ভাইরাস থাকলে শিশু জন্মের সময় এতে আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া একটি শিশুর শরীর থেকে অন্য শিশুর শরীরেও ছড়াতে পারে। যাকে বলে ইনঅ্যাপারেন্ট পেরেন্টেরাল ট্রান্সমিশন। হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ বা ‘‌সি’‌ আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক, হাসপাতাল, ডায়ালিসিস ইউনিট, সেলুন, ট্যাটু করানো ইত্যাদি থেকেও ছড়াতে পারে। আক্রান্তের থালা, বাসন, গয়না, জামাকাপড় থেকেও হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–র ভাইরাস ছড়ায়। তবে মনে রাখবেন, আক্রান্তের সঙ্গে করমর্দন, আলিঙ্গন বা প্রণাম ইত্যাদিতে রোগ ছড়ায় না।

উপসর্গ ও রোগ নির্ণয় কীভাবে?‌
ডাঃ দাস:‌ হেপাটাইটিস ভাইরাসের অ্যাকিউট সংক্রমণের লক্ষণগুলো হল— বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, খাওয়ায় অরুচি, শরীরে ব্যথা, হালকা জ্বর, গাঢ় হলুদ প্রস্রাব ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে, হেপাটাইটিসের রোগ হলে সবসময়ই তাতে জন্ডিস হয় না। দীর্ঘদিন এ ধরনের উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে HBsAg এবং অ্যান্টি–এইচসিভি পরীক্ষা করুন। হেপাটাইটিস ‘‌এ’‌ এবং ‘‌ই’‌ ভাইরাসের জন্য রক্ত পরীক্ষাও করা হয়। লিভার ফাংশন টেস্ট, আলট্রাসাউন্ড, সিটি স্ক্যান, এন্ডোস্কোপি, রক্ত জমাট বাধার পরীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে বোঝা যায় লিভারে হেপাটাইটিস বাসা বেঁধেছে কিনা।

কোনও মহিলা যদি ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হন তাহলে কি তিনি বিয়ে বা পরবর্তীকালে সন্তানধারণ করতে পারবেন?‌
ডাঃ দাস:‌ আজ থেকে ৪০ বছর আগে আমাদের ধারণা ছিল কোনও মহিলা যদি ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হন তাহলে তিনি বিয়ে করতে পারবেন না। আর যদি বিয়ের পর হেপাটাইটিস ধরা পড়ত, তাহলে গর্ভে সন্তান এলে তা নষ্ট করে ফেলা হতো। আজকের বিজ্ঞান এই ধারণার বিনাশ করেছে। হেপাটাইটিসে আক্রান্ত যে কোনও মহিলাই বিয়ে করতে পারেন এবং সন্তানধারণেও কোনও বাঁধা নেই। এখন গর্ভাবস্থাতে এর চিকিৎসা রয়েছে এবং সন্তান জন্মের সময়ই তাকে ভ্যাকসিন ও ইমিউনোগ্লোবিন দেওয়া হয়, যাতে রোগটা তার মধ্যে না আসে। 

আক্রান্ত হলে সুস্থ জীবনে ফেরার কী কী পথ রয়েছে?
ডাঃ দাস:‌ জন্ডিস হলেই যে সবসময় শুয়ে থাকতে হবে বা সেদ্ধ খেতে হবে তা নয়। একজন সুস্থ মানুষের চেয়ে সারাদিনে দ্বিগুণ পুষ্টির প্রয়োজন জন্ডিস আক্রান্তের। সুস্থ অবস্থায় প্রতিদিন আমাদের প্রোটিনের প্রয়োজন ১ গ্রাম/কেজি (শরীরের ওজন)। জন্ডিসের প্রথম দিকে লিভার সেল ভেঙে যাওয়ায় বমি বমি ভাব আসে। এ সময় পরিমাণ মতো ভাত, ডাল, মাছ, তরকারি, ডিমের সাদা অংশ, চিকেন খেতে পারেন। জন্ডিসের সঙ্গে হলুদ ছাড়া রান্না খাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। শরীরে প্রতিদিন ৬–৮ চামচ তেলের প্রয়োজন। বাড়িতে তৈরি যে কোনও পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন। তবে গ্লুকোজ, আখের রস, বাতাবি লেবু বা বাজার চলতি টনিক জন্ডিস সারাতে পারে এর কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই। খবু জরুরি স্ট্রেস মুক্ত থাকা। আর বিছানায় শুয়ে থাকারও কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবে শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন। সুস্থ হতে সাধারণত ২ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস সময় লাগে।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু বলুন.‌.‌.‌
ডাঃ দাস:‌ বাচ্চা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই, এমনকি যে কোনও বয়সেই হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–এর ভ্যাকসিন নেওয়া যায়। যাঁদের একবার ক্রনিক হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ হয়ে গেছে তাঁদের পুরোপুরি এ রোগ নির্মূল হয় না। তবে তখন ওষুধের সাহায্যে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা, ভ্যাকসিন ও ওষুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–কে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ ও কিছু ক্ষেত্রে নির্মূল করাও সম্ভব হয়েছে। এখন কলকাতাতেই হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌সি’‌–এর চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে। হেপাটাইটিস ‘‌সি’‌–কে নির্মূল করার কর্মযজ্ঞ অনেকটাই এগিয়েছে।

চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থকর্মীদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?‌  
ডাঃ দাস:‌ বলাই বাহুল্য চিকিৎসক এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–র ভ্যাকসিন অবশ্যই নিতে হবে এবং সচেতন থাকতে যাতে একজন রোগীর থেকে রোগটা ছড়িয়ে না পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (‌হু)‌–র গাইডলাইন মেনে হাইজিন মানতে হবে, রোগীর শুশ্রূষার সময় হাতে গ্লাভস পড়তে হবে। এছাড়া অন্যান্য প্রিকরশন তো রয়েছেই।

এটা তো লিভারের অসুখ। তাহলে লিভারকে সুস্থ রাখতে কী করণীয়?‌
ডাঃ দাস:‌ কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে সচেতনতা বাড়ান। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকুন। লিভারে কোনও অসুখ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলুন। টাটকা ফল, শাক সবজি খান। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ধূমপান, মদ্যপান এড়িয়ে চলুন। আর হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ এবং ‘‌এ’‌ প্রতিরোধের ভ্যাকসিন নিন। হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌–এর ভ্যাকসিন দূর করে ক্যান্সারকেও। একজন হেপাটাইটিস ‘‌বি’‌ বা ‘‌সি’‌–এর রোগী সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করুন। চলুন, আজ থেকেই শপথ নিই— সচেতনতা আর বিজ্ঞানমনস্কতায় ভর করে আমরা হারাব হেপাটাইটিসকে। জানব, বুঝবো, জিতবো রে.‌.‌.‌‌

সাক্ষাৎকার:‌ প্রীতিময় রায়বর্মন‌‌
সব ছবি: আন্তর্জাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *