কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে প্রেমালাপ
প্রীতিময় রায়বর্মন

রাতের তমশা কেটে কুয়াশাচ্ছন্ন প্রকৃতি নতুন দিনের স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। আলসেমি ভেঙে পুবাকাশে সূর্যোদয়ের তোড়জোড়। ট্রেন ছুঁল নিউ জলপাইগুড়ি। মাটির ভাড়ে গরম চায়ে গলা ভিজিয়েই গাড়ির খোঁজ। চলেছি ইচ্ছেগাঁও। পথ যত এগোচ্ছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে বাড়ছে একান্ত আলাপচারিতা। হিমালয়ের কোলে এনজেপি থেকে ৯০ কিমি আর কালিম্পং থেকে মাত্র ১৭ কিমি দূরে ৫,৮০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ি গ্রাম ইচ্ছেগাঁও। 

লেপচা ভাষায় ‘ইচ্ছেগাঁও’ শব্দের অর্থ পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় অবস্থিত গ্রাম। দেখলে মনে হয় শিল্পীর তুলির টানে ক্যানভাসে রূপ পাওয়া এক গ্রাম। পাহাড়ি হ্যামলেট, নজরকাড়া কটেজ প্রস্তুত অতিথিদের স্বাগত জানাতে৷ উঠলাম হোম স্টে-তে। আতিথেয়তায় মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই৷ ভীড়ভাট্টা তেমন নেই। হোম স্টে-র ব্যালকনিতে আরামকেদারায় বসে হিমালয়ের রানী কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে শুরু প্রেমালাপ।

যাঁরা একটু নিরিবিলি পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির মাঝে দিন দুই-তিনেক হারাতে চান তাঁদের জন্য বেস্ট ডেস্টিনেশন হতে পারে ইচ্ছেগাঁও। ঘুরতে ফিরতে নজরে পড়বে ৩০০ বছরের পুরনো লেচপা ঘরবাড়ি। দেখে নিন সাংচেন দোর্জে মনাস্ট্রি। দুধসাদা ঝর্না, শ্বেতশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা, ‌‌পাইনের জঙ্গল আর পাহাড়ের গায়ে ছোটছোট জনপদ— প্রকৃতির কী অপূর্ব নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্য!‌ প্রকৃতির সঙ্গে প্রেমালাপের মাঝে নজরে এলো সূর্য পশ্চিমাকাশে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার ঘরে ফেরার পালা।

রাতের ইচ্ছেগাঁও হতাশ করবে না। আকাশ পরিষ্কার থাকলে রাতের আকাশে জোনাকির মতো জ্বলজ্বলে তারা আর পাহাড়ি জনপদে বাড়ির জানলা ভেদ করে বেরোনো হালকা আলোর ছটা— সে এক অনন্য অনুভূতি। ইচ্ছেগাঁওয়ের রাতের সৌন্দর্য একেবারে অন্যরকম। মন ভাল করা প্রাকৃতিক মুগ্ধতাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালেও, মনের মধ্যে চলতেই থাকে সারাদিনের নৈর্সগিক শোভার আনাগোনা।

দু’রাত ইচ্ছেগাঁওয়ে কাটিয়ে আবার আসার ইচ্ছেকে সঙ্গে নিয়ে চলেছি সিলারিগাঁও হয়ে ঋষিখোলা। ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘায় সূর্যোদয় আর পাখির কলতানে পাইনের জঙ্গলকে সাক্ষী রেখে ট্রেকপথে ছোট্ট সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম সিলারিগাঁও। চাইলে রামধুরা থেকেও ঘুরে আসা যায়। কাছেই পড়বে জলসা বাংলো। সিঙ্কোনা ও নানা উদ্ভিদের সমাহার। সিলারিগাঁও থেকে ৬ কিমি দূরে পেডং।

ওক, পাইন, বার্চ আর দেবদারুর ছায়ার শান্ত–নিরিবিলি জনপদ। উত্তরে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু আর পাণ্ডিম। ৫,৪০০ ফুট উচ্চতায় ক্রস হিল থেকে চারপাশে কী অপূর্ব শোভা!‌ দেখে নিন ১৮৩৭ সালে ভুটানিদের তৈরি পেডং মনাস্ট্রি। সময় থাকলে ২ কিমি ট্রেকপথে ঘুরে আসতে পারেন ব্রিটিশদের হাতে বিধ্বস্ত ১৬৮০ সালে ভুটানিদের তৈরি ডামসিং দুর্গ, সেন্ট জর্জেস স্কুল।

পেডং থেকে রেনকের পথে ১৩ কিমি দূরে বাংলা–সিকিম সীমান্তে ১,৭০০ ফুট উচ্চতায় ঋষিখোলা। আপন গতিতে বইছে খরস্রোতা ঋষি নদী। ‘খোলা’ নেপালি শব্দ, যার অর্থ খাল। নদীর চঞ্চলতায় যেমন শরীরের ক্লান্তি দূর হয়, তেমনই বাড়ে মনের উন্মাদনা। নদীর ওপরে বেশ শক্তপোক্ত বাঁশের সাঁকো। পাশেই নেমেছে ট্রেকপথ। ঋষিখোলায় নদী–পাহাড়-জঙ্গলের সমাহারে চোখের আরাম আর মনের আনন্দকে সঙ্গী করে এবার বাড়ি ফেরার পালা। তবে একবার এলে ভালোবাসা এতটাই নিবিড় হয় যে মন চায় বারবার ছুঁটে আসতে।

রুটম্যাপ
যাওয়া:‌ হাওড়া বা শিয়ালদা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার জন্য রয়েছে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, দার্জিলিং মেল, পদাতিক এক্সপ্রেস, তিস্তা-তোর্সা এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন। এনজেপি থেকে ৯০ কিমি এবং বাগডোগরা থেকে ৯১ কিমি দূরে ইচ্ছেগাঁও। এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে সরাসরি গাড়িতে বা শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে ইচ্ছেগাঁও। কালিম্পং থেকে দূরত্ব ১৮ কিমি। ইচ্ছেগাঁও বা কালিম্পং থেকে পেডংমুখী গাড়ি ধরুন। পেডং থেকে ঋষিখোলার দূরত্ব ১৫ কিমি।‌

থাকা:‌ প্রতিটা পাহাড়ি জনপথেই থাকার জন্য সবচেয়ে ভাল হোম স্টে। রাজ্য পর্যটনের অনুমোদিত হোম স্টে-র জন্য লগঅন করুন ‌wbtourismgov.in‌। অজস্র হোম স্টে–র পাশাপাশি পাবেন কিছু ইকো রিট্রিট ও রিসর্ট।‌‌

সব ছবি:‌ আন্তর্জাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *