‌অজানা ব্যক্তিত্ত্বের ‘উৎপল দত্ত’ 
(২৯ মার্চ, ১৯২৯ — ১৯ আগষ্ট, ১৯৯৩)
সুমন কল্যাণ চক্রবর্তী

যিনি একদিকে বাংলা নাটক, থিয়েটার ও চলচ্চিত্র জগতে সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করেন, তেমনি অপরদিকে তিনিই আবার নাট্যকার, লেখক, পরিচালক কিংবা গণনাট্য আন্দোলনের পুরোধা, তিনি আর কেউ নন, গ্রুপ থিয়েটারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও মঞ্চের কারিগর ‘শ্রী উৎপল দত্ত’। তিনি যে কেবল কমিউনিষ্ট বিপ্লবের প্রচারক ছিলেন তা বললে হয়ত ভুল বলা হবে। কারাবাস কিংবা দুষ্কৃতি দিয়ে তাঁর নাটকের উপর আক্রমণ হলেও কোনো কিছুই থামাতে পারেনি সাম্যবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত তার ব্যক্তিত্ত্বকে। তার পুরো নাম শ্রী উৎপলরঞ্জন দত্ত। বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত এবং মা শৈলবালা রায় (দত্ত)–এর পাঁচ পুত্র ও তিন মেয়ের মধ্যে উৎপল দত্ত হলেন চতুর্থ সন্তান। বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ছিলেন তৎকালিন ভারতের ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের কারাগারের ‘কমান্ড্যান্ট’। ওঁনাদের পারিবারিক গুরু, ছোট্ট উৎপলের নাম রেখেছিলেন ‘শঙ্কর’, যে নামটি ডাকনাম হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে তাদের বাড়ির লোকজনের কাছে। বাংলাদেশের বরিশাল জেলার কীর্তনখোলায় জন্মগ্রহন করেন তিনি, যদিও তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান কুমিল্লা জেলায় ছিল।

উৎপল দত্ত তাঁর স্কুল জীবন শুরু করেছিলেন শিলং শহরের সেন্ট অ্যাড্‌মন্ড স্কুলে। তাঁর বাবার বদলির চাকরীর জন্য তিনি বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। এই সময়ে নাকি বিপ্লবীর ভয়ে স্কুলে যাতাযাতের সময়ে তাঁর সঙ্গে দেহরক্ষী থাকত বলে শোনা যায়। বাড়িতে য়েকর শিক্ষা–সংস্কৃতির প্রভাব এবং তার মেজদা মিহিররঞ্জন দত্ত ছোটবেলা থেকেই উৎপল দত্ত–কে শেক্সপিয়ারের নাটক পড়ে এবং রেকর্ড প্লেয়ার চালিয়ে নাটক শোনানোটাই উৎপল দত্তের জীবনে এক দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবয়স থেকেই উৎপল দত্তের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। মাত্র ছয়–সাত বছর বয়স থেকেই তিনি শেক্সপিয়ারের নাটকের বড়ো বড়ো সংলাপ হুবহু মুখস্থ বলতে পারতেন। ১৯৩৯ সালে ওঁনার বাবা চাকরিসূত্রে কলিকাতায় বদলি হয়ে আসেন এবং ওঁনারা দক্ষিণ কলিকাতায় বসবাস শুরু করেন। কলিকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইংরেজি পড়ার সময়ে প্রথম পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসলেও অভিনয় করার প্রতি তাঁর অতটা ঝোক হয়নি। উৎপল দত্তের ইচ্ছে ছিল ‘কনসার্ট পিয়ানিস্ট’ হওয়ার, কিন্তু শিক্ষিকা মিসেস গ্রিনহল উৎপল দত্তের হাতের আঙুলের দৈর্ঘ্য কম হওয়ার জন্য তাঁকে জানিয়ে দেন তাঁর পক্ষে ‘কনসার্ট পিয়ানিস্ট’ হওয়া সম্ভব নয়।

১৯৪৭ সালে প্রথম ইংরেজি থিয়েটারের জগতে পা রাখেন ‘উৎপল দত্ত’। নিকোলাই গোগোলের ‘ডায়মন্ড কাটস ডায়মন্ড’–এর অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে ওঁনার নাট্য অভিনয়ের শুরু। সেই সময়ে তাঁর সহপাঠী অভিনেতাদের মধ্যে ছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়, প্রতাপ রায় প্রমুখ অভিনেতারা। আর এই সকল বন্ধুদের নিয়েই তাঁর প্রথম নাট্যদল ‘দি অ্যামেচার শেক্সপিরিয়ন্স’ মাত্র আঠারো বছর বয়সে তৈরী করেন। ১৯৪৯ সালে এই নাট্যদলটির নাম পাল্টে হয় ‘কিউব’। ১৯৫০ সালে সেটির আবার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’। ওঁনার এক বন্ধু, পুরুষোত্তম লালের কথায়, ‘উৎপল হল বর্ন ব্রিলিয়ান্ট। ঐ বয়সেই শেক্সপিয়ারের জগতকে যেমন আবিষ্কার করেছিল, তেমনিই মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন–ও তার আয়ত্তে ছিল’। ১৯৬০ সালে থিয়েটার অভিনেত্রী শোভা সেন–কে বিয়ে করেন তিনি। তাদের একমাত্র মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত, বর্তমানে দিল্লীতে অবস্থিত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ–এর স্কুল অফ আর্টস এন্ড অ্যাসথেটিক–এর অধ্যাপিকা। উৎপল দত্ত একসময়ে কলিকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। পন্ডিত শ্রেণির এই ব্যক্তি ইংরেজি ছাড়াও স্প্যানিশ ও জার্মান ভাষায় অসম্ভব দক্ষ ছিলেন।

উৎপল দত্ত রচিত ও অভিনিত বেশ কয়েকটি নাটকের মধ্যে ‘টিনের তলোয়ার’, ‘বণিকের রাজদন্ড’, ‘কল্লোল’, ‘আজকের শাহজাহান’, ‘লোহার ভীম’, ‘দাঁড়াও পথিকবর’ খুবই উল্লেখযােগ্য। একবার ধানবাদ অঞ্চলের জামাডোবায় চিনাকুড়ি ও বরাধেমো কয়লাখনির খাদে আগুন ধরে যায়। মালিকপক্ষ কেবলমাত্র খনির কথা চিন্তা করে জল ঢুকিয়ে দেন খনি বাঁচানোর জন্য। সেই সময় আটকে পড়া বেশ কিছু শ্রমিক মারা যায়। এই খবর অভিনেতা রবি ঘোষ ও উৎপল দত্তের এক আত্মীয়ের মুখে শুনে উৎপল দত্ত সেই কয়লাখনিতে গিয়ে জীবিত খনির শ্রমিকদের সাথে কথা বলেন ও খনির ভিতরের শব্দ রেকর্ড করেন। তারপর তিনি মিনার্ভার তিনতলার একটি ঘরে বসে পনেরো দিনের মধ্যে লিখে ফেলেন ‘অঙ্গার’ নামক একটি বিখ্যাত নাটক। ১৯৫৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রযোজিত এই নাটকটি আজও বাংলা নাটকের একটি ‘মিথ’ হিসেবে পরিগণিত আছে। সুহাসিনী মুলে ও উৎপল দত্ত–কে একসাথে অভিনয় করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন মৃণাল সেন তাঁর ‘ভুবন সোম’ সিনেমায়, যেটি বনফুলের একটি লেখা নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এই সুহাসিনী মুলে ‘লগান’ সিনেমায় আমির খানের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। উৎপল দত্তের স্মৃতিশক্তি দারুণ ছিল। পাতার পর পাতা ডায়লগ মুখস্থ করে মনে রাখতে পারতেন, অনেক সময়ে ওঁনার সহ অভিনেতারা ওঁনার সাথে মঞ্চে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারতেন না। উৎপল দত্ত একবার ‘মেকআপ’ নিয়ে বেরিয়ে গেলে তিনি আর কখনোই মেক আপ রুমে যেতেন না। ১৯৫১ সালে উমানাথ ভট্টাচার্যের এক রাতের মধ্যে লেখা ‘চার্জশীট’–টি হল ভারতের গণনাট্য সঙ্ঘের প্রথম পথনাটিকা, যেটি সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল কলিকাতার হাজরায় বলে জানা যায়। এই নাটকে উৎপল দত্তের সঙ্গে স্বয়ং ঋত্বিক ঘটকও অভিনয় করেছিলেন।

শোনা যায়, একবার নাকি কোনো একটি কারণে পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল উৎপল দত্তকে। রাত যখন প্রায় পৌনে একটা বাজে, কলিকাতার টেম্পল রোডের সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে ফোন যায়। এই সময়ে সত্যজিৎ রায় পুলিশের কাছ থেকে উৎপল দত্তকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। মধু বসু পরিচালিত ‘মাইকেল মধুসূদন’ সিনেমায় মধুসূদনের ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করেন উৎপল দত্ত। একটি সাক্ষাৎকারে উৎপল দত্ত বলেছিলেন, ‘সিনেমা করি পেটের জন্য আর থিয়েটার করি জীবনের জন্য।’ ১৯৬৫ সালে ২৩ সেপ্টেম্বর ‘ভারতরক্ষা’ আইনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন উৎপল দত্ত। সাতমাস জেলে থাকাকালিন লেখালিখিই কেবল করে গেছেন তিনি। সত্যজিৎ রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘উৎপল দত্ত যদি রাজি না হয়, তাহলে তিনি আগন্তুক সিনেমাটি তৈরী করবেন না’। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘অমানুষ’, ‘গোলমাল’, ‘গুড্ডি’, ‘শওকিন’ প্রভৃতি সিনেমায় খলনায়ক কিংবা সম্পূর্ণ অভিনেতা হিসেবে এক অনবদ্য অভিনয় করে গেছেন বলে অনেক পরিচালক ব্যক্ত করেছেন।

উৎপল দত্ত ১৯৭০ সালে ‘ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট অ্যাক্টর’–এর সম্মান পান ‘ভুবন সোম’ সিনেমায় ভুবন সোমের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। তিনি ‘ফিল্ম ফর বেস্ট কমেডিয়ান’–এর খেতাব পান ১৯৮০, ১৯৮২ এবং ১৯৮৭ সালে। এছাড়াও, সহ অভিনেতার খেতাব পান ‘অমানুষ’, ‘সাহেব’ ও ‘গোলমাল’ সিনেমার জন্য। ১৯৯০ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি ফেলোশিপ পেয়েছিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ সিনেমায় অভূতপূর্ব অভিনয়ের জন্য ‘বেঙ্গলি ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড’ পান ১৯৯৩ সালে। উৎপল দত্ত বাস্তব জীবনে খুব গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন, তবে হাস্যরসে ভরা থাকত তাঁর কথাগুলি। ডাক্তারদের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে অতিথি হিসেবে আনা হয়েছিল একবার, যেখানে মাংস খাওয়ার খারাপ দিক সম্পর্কে বলতে বলা হয়। ওখানে তিনি একটি কথাই বলেছিলেন, ‘ঘাস পাতা–ই যদি খাব, তাহলে আমরা গাছ থেকে নামলাম কেন?’ কী দারুণ মজার কথা! ১৯৯৩ সালের ১৯ আগষ্ট উনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নাটকের মঞ্চ থেকে রূপলি পর্দায় সমান দক্ষতায় সকল ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করে গেছেন তিনি। বাংলা বা হিন্দি সিনেমা কিংবা থিয়েটার মঞ্চ— এককথায় সব জায়গাতেই তাঁর অবদান মানুষের মনে চিরস্মরনীয় হয়ে আছে, সে ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত।

Comments

  • In my opinion you commit an error. Write to me in PM.
    - JesseDit

    Fri, Aug 20, 2021 1:05 PM

  • শ্রদ্ধেয় উৎপল দত্ত এক মুগ্ধ বিস্ময়।
    - Rana Chatterjee

    Fri, Aug 20, 2021 8:14 PM

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *