‘পুলিপিঠের’ নামকরণের সার্থকতা
সুমন কল্যাণ চক্রবর্তী
পিঠেপুলির সঙ্গে বাঙালির হৃদ্যতা বহুকালের। বাঙালির ঐতিহ্যের খাবারের মধ্যে ‘পিঠেপুলি’-র জুড়ি নেই। কুয়াশা মাখা শীতের আমেজে বাঙালির যেন পিঠেপুলি না খেলে তৃপ্তি হয় না। বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতি ও পুলিপিঠের জন্ম প্রায় সমসাময়িক বলেই ধরা হয়। ‘পিঠেপুলি’— চালের গুঁড়ো, আটা, ময়দা, খেঁজুর গুড়, দুধ, নারকেল, এলাচ ও অন্যান্য কিছু শস্যজাত গুঁড়ো দিয়ে প্রস্তুত আদিম আভিজাত্যপূর্ণ এক সুস্বাদু ও উপাদেয় মিষ্টান্ন বিশেষ। এলাকা ভেদে ও আকৃতির উপর নির্ভর করে সাধারণত পিঠের নামকরণ করা হয়। পিঠের চমৎকার সুগন্ধ এবং শিল্পকলাকে সম্মান জানিয়ে ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রধানত পৌষ সংক্রান্তির সময়ে এই মিষ্টান্ন ভক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে। বৈচিত্রময় এই পিঠে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে খ্যাতি লাভ করেছে। দেড়শোরও বেশি ধরনের পিঠে থাকলেও মোটামুটি তিরিশ ধরনের পিঠের কদরই বেশি। বিখ্যাত কয়েকটি পিঠের নামকরণের সার্থকতার ইতিহাস ও জানা–অজানা তথ্য রইল আপনাদের উদ্দেশ্যে।
১) তেল পিঠে: নতুন চালের গুঁড়ো অথবা মিষ্টি দিয়ে (সাধারণত গুড় ব্যবহার করে) তেলে ভেজে প্রস্তুত পিঠেকে তেল পিঠে বলে। এই পিঠের ভেতর কিছু থাকে না। যে কোনো স্থানে চটজলদি প্রস্তুত এই পিঠে অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। এই তেল পিঠেই উত্তরবঙ্গে পাকান পিঠে বলে পরিচিত।
২) ভাপা পিঠে: চালের গুঁড়ো আর গুড় এই পিঠের মূল উপাদান হলেও নারকেলের শাঁস এই পিঠের স্বাদ বাড়াতে সাহায্য করে। চালের গুঁড়োয় সামান্য নুন ও জল মিশিয়ে চালুনি দিয়ে চেলে নারকেলের শাঁসকে থেঁতো করে খেজুর গুড় সহযোগে পাতলা কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ঢাকনা দেওয়া হাঁড়ির জলীয় বাষ্পের আঁচে ভাপ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় এই পিঠে। ভাপ দিয়ে তৈরির জন্যই এই পিঠেকে ভাপা পিঠে বলে। এই পিঠে প্রস্তুত করতে নিচ দিকে ছিদ্র করা একধরনের মৃৎপাত্রও ব্যবহৃত হয়, যাকে সিলেট অঞ্চলে গাইয়াড়ি বলা হয়। এই গাইয়ড়ি হাড়ির পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়।
৩) ছেছমা পিঠে: বিন্নি ধানের চালের গুঁড়ো, খেজুর গুড় এবং নারকেল দিয়ে প্রস্তুত পাটিসাপটা পিঠের মতোন দেখতে এক বিশেষ ধরনের পিঠেই হল ছেছমা পিঠে। প্রধানত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার বান্দারবান ও খাগড়াছড়ির পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী মারমা জনগোষ্ঠীর হাত ধরে জন্ম এই পিঠের। মারমা জনগোষ্ঠী এই পিঠেকে তাদের আঞ্চলিক ভাষায় ছাইস্ববক্ মু বলেই ডাকে। এটি মারমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পিঠে হলেও শীতকালে এই পিঠের চাহিদা দেশজোড়া থাকে।
৪) গোকুল পিঠে: দুধের ক্ষীর, নারকেল ও ছোট এলাচ দিয়ে প্রস্তুত পুরকে ঘি দিয়ে ভেজে নিয়ে ময়দার সঙ্গে দুধ সহযোগে প্রস্তুত হয় এই পিঠে। এটি প্রধানত জন্মষ্টমীর সময়ই বেশি বানানো হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণঠাকুরের বাল্যকাল ভারতের উত্তরপ্রদেশের গোকুল কেটেছিল বলে জানা যায় এবং শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে উপলক্ষে জন্মাষ্টমীকে গোকুলাষ্টমীও বলা হয়ে থাকে। শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে এই পিঠেকে ভোগ দেওয়া হয় বলে এই পিঠের নাম গোকুল পিঠে। জন্মাষ্টমীর ছাড়াও পৌষ সংক্রান্তির সময়ে এই পিঠে পশ্চিমবাংলায় প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
৫) নকশি পিঠে: নতুন চালের গুঁড়ো, মুগ ডাল, এলাচ ও দারচিনি সহযোগে প্রস্তুত এই পিঠেকে ঘিয়ে ভেজে অথবা দুধে ভিজিয়ে খাওয়া হয়। নবাব শায়েস্তা খাঁ-এর আমলে এই পিঠে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। শুকনো অবস্থায় এই পিঠের গায়ে খেজুর কাঁটা, পাটকাঠি বা হাতের আঙুলের সাহায্যে অথবা কখনো কখনো ছাঁচের সাহায্যে ফুল, পাখি, গাছ, মাছ প্রভৃতির নক্শা আঁকা হয়। নকশার বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই পিঠেকে শঙ্খলতা, কাজললতা, জামাইমুখ, সতীনমুচড়াও বলা হয়ে থাকে। নকশা করা থাকে বলেই এই পিঠেকে নকশি পিঠা বলে। বাঙালি নারীমনের শিল্পের অভিব্যক্তির এই পিঠে মেয়েলি পিঠে নামেও পরিচিত। নকশা আকারক্ষেত্রে পাক্কুয়ান পিঠে বা তেল পিঠের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার নারীদের সুনাম আছে। নকশি পিঠের উপকরণে প্রস্তুত নরম প্রকৃতির পিঠেকে ফুল পিঠে বলে।
৬) পাটিসাপটা: ঘন দুধের ক্ষীর, খেজুর গুড় ও নারকেল থেঁতো করে এলাচ সহযোগে পুর তৈরি করে; দুধ, ময়দা ও চালগুঁড়ো মেশানো মণ্ডকে লেচি তৈরি করে উক্ত পুর তার ভেতরে পুরে লুচির মত বেলে পাটির মত পাট করে ঘি-তে ভেজে প্রস্তুত করা হয় এই পিঠে। পাট করা লম্বা আকারের দেখতে বলেই এই পিঠের নাম পাটিসাপটা। ষোল শতকের শেষের দিকে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এবং বসিরহাটের পানিতার গ্রামের বিখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প পুঁইমাচা-তে পাটিসাপটার উল্লেখ পাওয়া যায়।
৭) চুঙ্গি পিঠে: বিন্নি ধানের চাল ও জল দিয়ে মিশ্রণ করে ছোট আকৃতির হালকা ছাল বিশিষ্ট একপ্রকার বাঁশের (মুলি প্রজাতির) ছোট কয়েকটি টুকরোতে (আঞ্চলিক ভাষায় একে চোঙার বাঁশ বলে) ভরে খরকুটো বা কাঠের আগুনে পুরিয়ে এই পিঠে প্রস্তুত করা হয়। চোঙা থেকে টেনে সাদা ভাতের লাঠির মত এই পিঠেকে বের করে খেজুর গুড়, মধু, মাছ, দুধের মালাই প্রভৃতি সহযোগে খাওয়া হয়। এই পিঠে প্রস্তুতিতে চোঙা ব্যবহৃত হয় বলে, একে চোঙা পিঠে, চুঙ্গি পিঠে বা চুঙ্গা পিঠে বলা হয়। চুঙ্গি পিঠের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। বহু আগে, সিলেট অঞ্চলে নাগা, কুফি, টিপারা প্রভৃতি পাহাড়ি আদিবাসীরা পাহাড়ে ঝুম চাষ করে জীবনযাপন করত। এই আদিবাসীরাই বাঁশ কেটে চুঙ্গা বানিয়ে অর ভেতর চাল ও জলের মিশ্রণ ভরে আগুনে সেঁকে একপ্রকার খাদ্য প্রস্তুত করত, যেটা পরবর্তীকালে চুঙ্গি পিঠে-তে রূপান্তরিত হয়েছে।
৮) খোলাজা পিঠে: ঢেঁকি ছাটা চালের গুঁড়ো, নুন ও জল দিয়ে মিশ্রণ করে (প্রয়োজনে ডিমও এই মিশ্রণে মেশানো হয়), একটি বিশেষ মাটির পাত্রের বা খোলার উপরিভাগে হালকা তেল মাখিয়ে আগুনে সেঁকে বা গরম করে নিয়ে মিশ্রণ গরম খোলায় ঢেলে চারদিক পুরু করে ছড়িয়ে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে প্রস্তুত করা হয় এই পিঠে। পিঠেটি দেখতে অনেকটা রুটির মতো হয় এবং এর গায়ে অনেক ছিদ্রও লক্ষ্য করা যায়। খোলায় তৈরি বলেই এই পিঠেকে খোলাজা পিঠে বলে। সুস্বাদু এই পিঠের নোয়াখালি অঞ্চলে জন্ম হয় বলে জানা যায়। খেজুর গুড় অথবা মধু দিয়েও এই খোলজা পিঠে পরিবেশিত হয়।
৯) খেজুর রসের ভেজা পিঠে: শীতকালে টাটকা খেজুর রসের সঙ্গে, দুধ ও গুড়ের সঙ্গে নতুন চালের গুঁড়ো, লবণ ও জল সহযোগে প্রস্তুত মিশ্রণকে আগুনে সেঁকে পিঠের সঙ্গে অনেকক্ষণ ভিজিয়ে রেখে এই পিঠে প্রস্তুত করা হয়। এই ধরনের পিঠের জনপ্রিয়তা যশোহর জেলায় হলেও সারা বাংলায় এর চাহিদা তুঙ্গে। এই পিঠে অনেক জায়গায় রস পিঠে নামেও পরিচিত।
১০) চিতই পিঠে: চালের গুঁড়ো, নুন ও জল দিয়ে প্রস্তুত মিশ্রণকে সরষের তেলে মাখানো মাটির সরায় রেখে সরাটিকে আরেকটি মাটির পাত্র দিয়ে ঢেকে আগুনের আঁচে বসানো হয়। নামানোর আগে সরায় জল ছিটা দিতে হয়। ইডলির মত দেখতে এই পিঠে খেজুরের রস অথবা খেজুর গুঁড় দিয়ে খেতে হয়। অঞ্চলভেদে এই পিঠের নাম আসকে পিঠে, চিকুই পিঠে বা সরা পিঠে নামেও পরিচিত। সম্ভবত বর্ণবিপর্যয়ের ফলে আক্সে শব্দ থেকে আস্কে বা আস্কে কথাটি এসেছে বলে ধরা হয়। জনপ্রিয় এই পিঠের জন্ম ভারত (পশ্চিমবঙ্গ) এবং বাংলাদেশে— যেটি উভয় জায়গায়ই প্রসিদ্ধতা লাভ করেছে।
১১) বিবিয়ানা পিঠে: তালের রস জ্বাল দিয়ে চালের গুঁড়ো, ময়দা, এলাচ সহযোগে মিশ্রণ তৈরি করে হালকা তেলে ভেজে এই পিঠে তৈরি করা হয়। এই পিঠে সাধারণত বরকে বরণ করা উপলক্ষে অথবা বিবি বা কনের পারদর্শিতা দেখাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই ধরনের পিঠে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারুকার্যমন্ডিত ও বর্ণাঢ্য হয়ে থাকে। জায়গা বিশেষে এই পিঠেকে ‘জামাই ভুলানো পিঠে’-ও বলা হয়। অতিথি বরণ স্বরূপ ‘দাওয়াত’ দিয়ে জামাইদের এই পিঠে খাওয়ানো হয় বলেই এই পিঠের এমন নাম।
১২) মালপোয়া: চাল গুঁড়োর সঙ্গে নারকেল কোরা, আটা, চিনি ও দুধ (প্রয়োজনে ক্ষীর) মিশিয়ে মিশ্রণ প্রস্তুত করে লবঙ্গ এবং ছোট এলাচের গুঁড়ো যোগ করে ভেজে তৈরি করা হয় মালপোয়া। অনেক জায়গায় ভাজার পর মিষ্টি রসে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখেও মালপোয়া বানানো হয়। ওডিশার মালপোয়ায় (আমালু) দই ব্যবহার করার প্রচলন আছে। জগন্নাথদেবের সকালের পুজোর জলখাবার (সংকল্প ধূপ) এবং সন্ধ্যা-আরতির ভোগ (সাঁঝধূপ) হিসেবে এবং বিহারের মিথিলাতে হোলির সময় মালপোয়া ব্যবহৃত হয়। শোনা যায়, বৈদিক যুগে আর্যদের সময়ে বার্লির প্রচুর উৎপাদন হত। তারা সেই বার্লির ময়দা ঘি দিয়ে ভেজে মধুতে চুবিয়ে আপুপা নামক একধরনের মিষ্টি প্রস্তুত করত যেটি পরবর্তিক্ষেত্রে মালপোয়া-র রূপ নিয়েছে।
এগুলো ছাড়াও পাতায় মুড়িয়ে যে পিঠে প্রস্তুত হয় তাকে পাতা পিঠে বলে, আকার অনুযায়ী, বড় ধরনের পিঠেকে হাঁড়ি পিঠে ও ছোট আকারের পিঠেকে খেঁজুর পিঠে বলা হয়। এগুলো ছাড়াও দুধ পুলি, চাপড়ি পিঠে, ছিট পিঠে, চাঁদ পাকানো পিঠে, ম্যারা পিঠে, ঝিকমিক পিঠে, মালাই পিঠে, মুঠি পিঠে, ঝিনুক পিঠে, সূর্যমুখী পিঠে, কুলি পিঠে অত্যন্ত জনপ্রিয়। শীতের সময় পিঠেপুলির নিমন্ত্রণ চিরন্তন ও শাশ্বত হয়ে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় আশিটি দেশে পৌঁছে সুখ্যাতি অর্জন করেছে।
সব ছবি: আন্তর্জাল
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments