অন্য নাসিরির গল্প
ডঃ সঞ্জীব রায়
মেহেরান করিমি নাসিরির জন্ম ১৯৪২ সালে ইরানের মসজিদ সোলেমানে। অবস্থাপন্ন পরিবার। বাবা ছিলেন ডাক্তার। ডাক্তারি করতে করতেই এক স্কটিশ মহিলাকে নার্সিং করতে দেখে ভালো লেগে যায়। তাঁকেই বিয়ে করেন। করিমি তাদেরই সন্তান। পড়াশোনায় মন্দ ছিলেন না করিমি। স্কুল–কলেজ শেষ করে যুগোস্লাভ ভাষা অধ্যয়নের জন্য তিনি ভর্তি হন ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের ব্রাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সূত্রে প্রথমবারের জন্য বিলেতে এসে তিনি সে দেশের প্রেমে পড়ে যান। পড়া শেষে ইরানে ফিরে শাহ শাসনের প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহন করেন। বস্তুতপক্ষে সে সময় ইরানে টালমাটাল অবস্থা ছিল।
নাসিরিকে শাহ শাসনের প্রতিবাদের শাস্তি হিসেবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে বলে এক গুজব রটে। সেই গুজবকে প্রাধান্য দিয়ে নাসিরি তরিঘড়ি দেশ ছাড়েন। পরবর্তীকালে জানা যায় যে, তাঁকে আদৌ দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। নাসিরি দেশ ছেড়ে মার্কিন মুলুকে পাড়ি দেন। সে সময় ইরান, ইরাক যুদ্ধের কারণে মার্কিনিরা তাঁকে দেশে প্রবেশ করতে দিতে অরাজি ছিল। ফলে নাসিরি নিউইয়র্কের জন কেনেডি বিমানবন্দরে কয়েকদিন আটকে থাকেন।
সেই আটকে থাকাকালীন তাঁর হয়ে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা চলতে থাকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে, যাতে তিনি আশ্রয় পান। বেলজিয়াম সরকার তাঁকে রাখতে রাজি হলেও নাসিরি সে দেশে থাকতে রাজি হননি। তিনি চেয়েছিলেন ব্রিটেনে থাকতে। তাঁর আশা ছিল যেহেতু তাঁর মা ব্রিটিশ সেহেতু তিনি সেখানে থাকার ব্যাপারে কিছু সুবিধা পাবেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ব্রিটেন তাঁকে থাকতে দিতে রাজি হয়নি।
এমন সময়ে নাসিরি জানান যে বিমানবন্দরে তাঁর নথিসমেত একটি অ্যাটাচি কেস চুরি হয়ে গেছে। যা ছিল সর্বৈব মিথ্যা। তিনি নথি চুরিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ফ্রান্স হয়ে ব্রিটেনে চলে যান।
যথারীতি হিথরো বিমানবন্দর থেকে তাকে পত্রপাঠ প্যারিসের শার্ল দে গল বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই দিনটি ছিল ১৯৮৮ সালের ২৬ আগস্ট। সেই শুরু তারপর থেকে দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি প্যারিসের শার্ল দে গল বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে, শুয়ে কাটিয়েছেন। তিনি ব্রিটেনে যাবেন সেই অভিপ্রায়ে নিজের নাম পাল্টে স্যার আলফ্রেড মেহেরান করেন। তিনি দীর্ঘ ১৮ বছর বিমানকর্মীদের দেওয়া খাবার ও জামাকাপড় পরেই কাটান।
২০০৩ সালে বিখ্যাত হলিউড পরিচালক স্পিলবার্গ নাসিরির জীবনী নিয়ে একটি সিনেমা করার অভিপ্রায়ে তাঁর সঙ্গে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে যোগাযোগ করেন। তাঁকে নিয়ে সিনেমার প্লট বা কাহিনির রয়্যালটির জন্য পরিচালক তাঁকে ২,৫০,০০০ ডলার দেন। যদিও সেই টাকা নাসিরির খরচ করার সুযোগ ছিল না। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে বিমানবন্দরের বাইরে বেরনোর সুযোগ দেয়নি। তাঁর ঘরবাড়ি বলতে সবই ছিল বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনাল।
২০০৬ সালের জুলাই মাসে নাসিরি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে এক নম্বর টার্মিনাল থেকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। রেড ক্রস স্যোসাইটি তাঁর দায়িত্ব নিলেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি (বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী)। অন্যদিকে ২০০৮ সালে স্পিলবার্গের পরিচালনায় মুক্তি পায় বিখ্যাত ছবি ‘দ্য টার্মিনাল’, যা কিনা মূলত নাসিরির জীবনআলেখ্য। নাসিরির ভূমিকায় টম হ্যাঙ্কস–এর অভিনয় বোধকরি দর্শকরা কোনও দিন ভুলতে পারবেন না। দীর্ঘ ১৮ বছর বিমানবন্দরে কাটানো অসহায় মানুষটির অসহায়তার করুণ ছবি টম হ্যাঙ্কসের অভিনয়ের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের মনে গাঁথা থাকবে।
সব ছবি: আন্তর্জাল
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments