‌ঘুড়ি–র সাতকাহন
সুমন কল্যাণ চক্রবর্তী

ঘুড়ি ওড়ানো মানে কি শুধুই বিনোদন? ‘ঘুড়ি’‌ কথাটি কোথা থেকে এসেছে? কেমন ছিল প্রাচীনকালের ঘুড়ি? বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কতটা অবদান এই ঘুড়ি–র? কলকাতায় কবে থেকে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হয়? 

ঘুড়ির মাধ্যমে মানুষ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, শিল্প, ধর্ম কিম্বা বিভিন্ন মিথকে ব্যক্ত করতে চেয়েছে, যা বিভিন্ন দেশের ইতিহাস থেকে জানা যায়। তাই, ঘুড়ি ওড়ানো মানে যে শুধু সবার শৈশবকে বাস্তবে নিয়ে আসা তা নয়, এই ‘‌ঘুড়ি ওড়ানো’‌–র মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্মৃতি, আবেগ ও পরম্পরাকে ধরে রাখার একটা বিশেষ ব্যাপার ও গুরুত্বও আছে। ময়ূরপঙ্খী, পেটকাটা, চাঁদিয়াল, বন্ধা, চৌরঙ্গি, মুখপোড়া ছাড়াও আরও কত কত নাম এই সব ঘুড়ির! আকাশ সংস্কৃতির যুগে ঘুড়ি ওড়ানোটাকে একটি বিশেষ গুরুত্বও প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক চর্চার ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে ‘‌ঘুড়ি উৎসব’‌, যেটি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মেঘমুক্ত আকাশে বিচিত্র ধরনের ও রঙবেরঙের ঘুড়িরা দোল খেয়ে নির্মল ও অনাবিল আনন্দ মানুষের মনে এনে দেয় এক স্মৃতির শৈশবও। এই ‘ঘুড়ি উৎসব’‌ মানুষের কাছে সাদরে গৃহীত হচ্ছে বলেই এতকাল ধরে টিকে আছে, একথা কিন্তু সত্যি! নির্মল আনন্দ পেতে গেলে ঘুড়ি ওড়াতেই হবে, আর তাতেই পাওয়া যাবে সোনালী স্বপ্নের পুরানো দিনগুলিকে। বিনোদনের রকমারী উপকরণ থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনের প্রতিদিনের দুঃখ কষ্ট ভুলে থাকতে যেন মানুষেরা আকাশে নিজের মনটাকে উড়িয়ে দেয়, ভুলে যায় জীবনের ব্যস্ততা আর ফিরে পায় শৈশবের দিনগুলি।

ইংরেজি শব্দ ‘কাইট’‌ অর্থে চিল বা বাজপাখিকে বোঝায়। এই চিল বা বাজপাখির সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ার মিল থাকার জন্য ঘুড়িকে ‘‌কাইট’‌ বলে বলে অনেকে মনে করেন। সংস্কৃত শব্দ ‘‌ঘূর্ণ’‌ থেকে ‘‌ঘুড়ি’‌ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘‌ঘোরা’‌। হিন্দি ‘‌ঘুড্ডী’‌ শব্দ থেকে কথাটি লোকমুখে ‘‌ঘুড্ডি’‌ হয়ে গেছে। এই ঘুড়ি জাপানে ‘তাকো’‌, ফ্রান্সে ‘‌সেফ ভোলেন্ট’‌, মেক্সিকোতে ‘পাপালোতে’‌, থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ায় ‘‌ওয়াই বা ল্যায়েন্স ল্যায়েন্স’‌ নামে পরিচিত। চীনদেশে ঘুড়ি ‘‌ইউয়ান’‌ নামে পরিচিত। চীনদেশে কাঠের ঘুড়ি ‘মু ইউয়ান’‌ ও কাগজের ঘুড়ি ‘‌ঝি ইউয়ান’‌ নামেও পরিচিত। চীনা ঘুড়ি ‘ফেং ঝিং’‌ বা ‘‌ফুঙ জুঙ’‌ বলেও অনেকের কাছে পরিচিত। চীনদেশের ‘লণ্ঠন ঘুড়ি’‌ খুব জনপ্রিয়। সাধারণত এগুলোতে সন্ধ্যের পর প্রদীপ জ্বালিয়ে আলো বসিয়ে আকাশে ওড়ানো হয়, যা রাতের অন্ধকারে এক অপরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করে। আফগানিস্তানের ঘুড়ি ‘‌গুড়িপারান বাজি’‌ নামে পরিচিত। রাশিয়া এবং আইসল্যান্ডের মানুষেরা ঘুড়ি খুব একটা ওড়ায় না বলেই জানা যায়। কাগজ ও পাতলা বাশ দিয়ে তৈরি সুন্দর সুন্দর মালয়েশিয়ার ‘‌হুইসেল ঘুড়ি’‌ কিংবা ভিয়েতনামের ‘‌মিউজিক্যাল ঘুড়ি’‌ও সারা বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
দেবদেবীর কাছে নিজেদের মনের বাসনা জানানোর জন্য রঙিন সুন্দর সুন্দর কাপড় ও পাতলা কাঠের নৃতাত্ত্বিক ঘুড়িও একসময়ে ওড়ানো হত। সপ্তম শতাব্দীতে উৎপাদিত ফসলকে অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা জাপানে প্রথমদিকে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা চালু করেন বলে একটি তথ্যমতে জানা যায়। পরবর্তীতে ইডো যুগে (১৬০৩–১৮৬৭) সামুরাই শ্রেণীর মানুষেরা ছাড়া সব শ্রেণীর মানুষেরা ঘুড়ি ওড়ানো শুরু করে দেয়।

ঘুড়ির আবিষ্কার নিয়ে অনেক রকমের তথ্য পাওয়া যায়। কেউ কেউ মনে করেন, আজ থেকে প্রায় চারশো খ্রিষ্টাব্দে গ্রিস দেশের টারাস্টাস শহরে আর্কিটাস্ নামক এক ব্যক্তিই নাকি সর্বপ্রথম ঘুড়ি আবিষ্কার করেন। অপর একটি তথ্যমতে, প্রাচীন সময়ের মোটামুটি ২৮০০ বছর আগে ছুনছিউ আমলে জনৈক এক দার্শনিক মুওছু প্রায় তিন বছর ধরে পাতলা কাঠ দিয়ে সর্বপ্রথম ঘুড়ি তৈরি করেন, যেটি হল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ঘুড়ি। আজ থেকে প্রায় দুশো খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তৎকালিন চীন দেশের ‘হান সিন’‌ নামক এক সেনাপতি নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে ও শত্রুপক্ষের গতিবিধি নজর রাখতে প্রথম ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। এর পর ঘুড়ি ওড়ানো আস্তে আস্তে চীন দেশ পার হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ যেমন কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে ঢুকে পড়ে। তেরো শতকের শেষভাগে ইতালির বণিক মার্কো পোলোর মাধ্যমে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন ঘটে বলে জানা যায়।
ভারতে সর্বপ্রথম ঘুড়ি ওড়ানো চালু হয় মোগলদের সময় কিন্তু সেটি জনপ্রিয়তা পায় নবাব বংশের ওয়াজেদ আলির পৃষ্ঠপোষকতায়, যিনি ঘুড়ি ওড়ানোকে লক্ষ্মৌ থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করেন। আর তার পর থেকেই শুরু হয় কলকাতায় ঘুড়ি ওড়ানো। ঊনবিংশ শতকের সময়ে কলকাতার ‘‌বাবু’‌ সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাহারী সব ঘুড়ি ওড়াতেন, যার মধ্যে পাঁচ, দশ কিংবা একশো টাকার নোট আটকানো থাকত। সেই সময়ে আভিজাত্যের অহংকারের জন্য ঘুড়ি ওড়ানোর সুতোয় মাঞ্জার ব্যবহার বেড়ে যায় মুঘলদের সময় থেকেও। আজকের মতন মাঞ্জায় কাঁচগুড়ার বদলে সেই সময়ে ব্যবহৃত হত চুনি ও পান্নার গুঁড়ো। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা মূলত সৃষ্টিশক্তির রূপক নাম। বিশ্বকর্মাই সহস্র শিল্পের কারিগর এবং কারুকার্যনির্মাতা। রামায়ণ মহাভারতের যুদ্ধের সব প্রকার অস্ত্র ছাড়াও শিবের ত্রিশূল, কার্তিকের শক্তি, জগন্নাথদেবের মূর্তিও ওনার হাতে তৈরি। বিশ্বকর্মা পুজোর সময়ে মোটামুটিভাবে বর্ষা বিদায় নেয় ও আকাশ মেঘমুক্ত থাকে। এই সময়ে কলকাতার আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোতে বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। বিশ্বকর্মাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে মানুষ ঘুড়ি উড়িয়ে নিজেদের অভিলাষ ব্যক্ত করা ছাড়াও শিল্পের নমুনা হিসেবে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে রকমারি ঘুড়ি ওড়ায় বলে অনেকে ধারণা করেন।

বহু আগে, চীনদেশের এক কৃষক মাঠে কাজ করার সময় তার টুপি প্রচণ্ড হাওয়ার জন্য বার বার মাথা থেকে উড়ে যাচ্ছিল। তিনি তখন নিজের টুপিকে দড়ি দিয়ে আটকে মাঠের ধারে একটা খুটির সঙ্গে বেঁধে দেন। একটু পরে হঠাৎ তার খেয়াল হয় ঐ হাওয়ার জন্য তার টুপি শূণ্যে উঠে ডাইনে–বায়ে দোল খাচ্ছে। তিনি এই ব্যাপারটিতে বেশ মজা পেলেন আর পার্শ্ববর্তী কিছু লোককে এই বিষয়টি দেখালেন। এই ঘটনা থেকে প্রথম ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যাপারটা মানুষের মাথায় আসে বলে অনেকে মনে করেন। সেই সময়ে চীনে পেঁজা তুলো বা শুকনো বড় মাপের পাতা ওড়ানোটাই নাকি ঘুড়ির রূপান্তর বলেও অনেকে মনে করেন। সেই ঐতিহ্য মেনেই আজও ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ‘পাতার ঘুড়ি’‌ ওড়ানো হয়। উড়ন্ত ঘুড়ির দিকে তাকালে চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো হয় এবং মস্তিষ্ক পরিষ্কার থাকে বলে চীনের মানুষেরা মনে করেন। শুরুর দিকে এই ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যাপারটা বেশ একটা বিনোদন এবং কৌতূহলের বিষয় থাকলেও ঘুড়িতে তথ্য লিখে যুদ্ধক্ষেত্রে তা শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্দিষ্ট লোকের কাছে পাঠানো হত বলে জানা যায়।

১৮২২ সালে আমেরিকান স্কুল শিক্ষক জর্জ পোকক নামক এক ব্যক্তি তার নিজের হাতে বানানো একজোড়া বিশেষ ঘুড়ির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘণ্টায় প্রায় কুড়ি মাইল গতিতে গাড়ি চালিয়েছিলেন। উইলিয়াম এডি এবং লরেন্স হারগ্রেভ নামক দুই ব্যক্তি ঘুড়ি ওড়ার কৌশল ও কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে আমেরিকার আবহাওয়া দপ্তরের পরিষেবা ও ক্যামেরার ব্যবহার করেন। ঘুড়ির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্লেডও টানার প্রমাণ পাওয়া যায়। নিউজিল্যান্ডের পিটার লিন স্টেইনলেস স্টিলের ঘুড়ি ওড়ানো চালু করেছিলেন। তাছাড়াও, জল ও বরফের ওপর থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশল উনিই চালু করেন। এছাড়াও, স্যামুয়েল ল্যাংলি, স্যার জর্জ ক্যালি, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, রাইট ব্রাদার্স— এনারা প্রত্যেকেই ঘুড়ি ওড়ানো নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা করেছিলেন। ১৭৪৯ সালে স্কটিস বিজ্ঞানী টমাস মেলভিন ও আলেকজান্ডার উইলসন ঘুড়ির সঙ্গে থার্মোমিটার লাগিয়ে আকাশের তাপমাত্রা নির্ণয় করেছিলেন। আকাশের বিদ্যুৎ ও কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত বিদ্যুৎ যে একই রকমের সেটা ১৭৫২ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ঘুড়ি উড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ডগলাস আর্কিবন্ড ঘুড়িতে ‘‌অ্যানিমোমিটার’‌ বেঁধে বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ মেপেছিলেন বলে জানা যায়। বিজ্ঞানী মার্কনী ১৯০১ সালে ঘুড়িতে অ্যান্টেনা লাগিয়ে আকাশের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার বৈজ্ঞানিক লরেন হারগ্রাভস ১৮৯৩ সালে একধরনের থ্রি–ডাইমেনশানাল ঘুড়ি তৈরি করেছিলেন, যেটা থেকে এরোপ্লেনের মডেল তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সৈন্যরা ‘বক্স ঘুড়ি’‌ (বাক্সের মতন দেখতে)‌ ব্যবহার করত শত্রুপক্ষের সাবমেরিনের গতিবিধি বোঝার জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হ্যারি শৌল–এর তৈরি ‘ব্যারেজ ঘুড়ি’‌ শত্রুপক্ষের এরোপ্লেনকে বেশি উঁচুতে উড়তে বাঁধা দিত। তৎকালিন সময় গিবসন গার্লস বক্স ঘুড়িগুলি সমুদ্রের কাছে হারিয়ে যাওয়া পাইলটদের নিজেদের খুঁজে পেতে ব্যবহৃত হত। সমুদ্রের উপর উড়ন্ত এরোপ্লেনের অবস্থান খুঁজে পেতে পল গারবারস–এর তৈরী ‘টার্গেট কাইট’‌ নামক একপ্রকারের ঘুড়ি ওড়ানো হত। এছাড়াও, এই ধরনের ঘুড়ি নানান ধরনের সংকেত আদান–প্রদান করার কাজেও ব্যবহৃত হত। ঐ সময়ে বেশ কিছু ধরনের ঘুড়িতে ‘‌এরিয়াল’‌ লাগিয়ে রেডিও সংকেত পাঠানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হত। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উপর ঝুলন্ত সেতু সম্পর্কিত তথ্য পাওয়ার জন্য বেশ কয়েকবার ঘুড়ি ওড়ানো হয়েছিল। তাই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এবং মানুষের জীবনে রঙ মশাল জ্বালাতে রঙবেরঙের ‘ঘুড়ি ওড়ানো’‌ যেন এক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

সব ছবি:‌ আন্তর্জাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *