আজ দোল উৎসব
বিজন বেপারী
তোমাকে রঙিন আবির দিয়ে রাঙাতে পারি না
তোমার মনকেও ছুঁতে পারি না
তোমার ভালবাসার পাত্রও আমি নই;
শুধু তোমাকে ভাবতে পারি
শুধু চোখের জলে ভাসতে পারি
তোমাকে মনের কথা বলতে পারি অলক্ষ্যে
তুমি হয়তো শুনতে পাও না
এই ক্ষুদ্র মানুষের ক্ষুদ্র বাসনা।
তুমি আমার একাল সেকাল
আমার অন্তর্যামী
আমার বাঁচা মরার নির্বাচক
তুমি আমার সেই দুষ্টু রাখাল বালক
আমার ভগবান, শ্রীকৃষ্ণ...
তোমার রাঙা পায়ে আবির মাখা ভালোবাসা।
আজ দোল উৎসবে...
লাল ফাগুনে
মধুছন্দা চক্রবর্তী
লাল ফাগুনে রাঙা আগুন পলাশে শিমুলে
লাল মাটির ওই গন্ধ মাতাল নাচরে মাদল তুলে
এই পাহাড় পাহাড় পাহাড়
আহা! চারধারে দ্যাখ পাহাড়
পুরুলিয়ায় ঢল নেমেছে বসন্ত লাল বাহার।
দখিন হাওয়া আবির রাঙায়
গাল থেকে এই মনে
কোকিলারা মিঠেমিঠে গাইছে ক্ষণে ক্ষণে
নেশা নেশা মহুল নেশা কাজল দু’নয়নে
পিরিতি রং মায়ায় মজে নীল আকাশের পানে
হায় লাজুক সোহাগ উথলে ওঠে
পাগল প্রেমিক প্রাণে
পলাশ রঙে রাঙিয়ে দেনা এই ভরা যৌবনে।
চল্ দুজনে যাই হারিয়ে ঝুমুর নাচের তালে
আহা! লাল সবুজ আর সবুজ লালের
আড়ালে আড়ালে।
বসন্তের আগমনে
মহসিন আলম মুহিন
ঋতুরাজ এলো রাজার বেশে, কৃষ্ণচূড়া সাজে নতুন সাজে,
কোকিল ডাকে মধুর সুরে, ভ্রমরাগুলো আকাশে ওড়ে।।
ফুল ফুটুক আর না ফুটুক—মনের মাঝে আজ বসন্ত,
কোকিলের কুহু কুহু তানে, ঢেউ জাগে প্রাণে অফুরন্ত।।
প্রাণের মাঝে লাগে দোলা, মনের জানালা খোলা মেলা,
ফুল বাগানের মিষ্টি ঘ্রাণ, গাছেরা আবার পেলো প্রাণ।।
পাখিরা আজ গাইছে গান, যৌবন জুড়ে নয়া তুফান,
মন হারায় ওই দিগন্তে, নেচে নেচে উঠে হিয়া ‘বসন্তে’।।
ফাগুন রাঙা মন
কনক কুমার প্রামাণিক
ফুলে ফুলে ভরে উঠুক
ধারার সকল অন্তর,
ফাগুন রঙে রঙিন হবে
প্রকৃতির সব ঘর।
কৃষ্ণচুড়া লাল হয়েছে
ফাগুনের এ কালে,
গাছ গাছে লাগে আগুন
রাঙা শিমুল ডালে।
মধুর সুরে কোকিলের গান
মনটা পাগল করে,
স্নিগ্ধ শোভা বেজায় লাগে
মন থাকে না ঘরে।
রঙের দাগ
অজিত কুমার জানা
আঙুলে স্পর্শ থাকে,
যার ভিতরে আগুন শরীর।
জীবন্ত তিরিশ সেকেন্ডের ভূকম্পন,
রিখস্টার স্কেলে মাত্রা চার দশমিক পাঁচ।
হাওয়াই বাজি যার আয়ু,
মুহূর্তেই ঝরে পড়ে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ।
ছাইভস্ম হয়ে মাটিতে মিশে,
জন্ম–মৃত্যু স্পরস্পরের আলিঙ্গন।
আঙুলে যদি দোলের রঙ মাখে,
স্পর্শ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে,
অস্বস্তির ফ্ল্যাট বানায়।
মূল মাটির গভীর নামে,
চাওয়া–পাওয়ার কেন্দ্র একটাই।
লাটিম ঘুরতে থাকে,
রঙ মুছে গেলেও,
মোছে না রঙের দাগ।
বসন্ত দিন আসুক
রঙের ভুবন ভাসুক
কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়
চারদিকে আজ পলাশ আগুন রঙ ছড়িয়ে পাতায়
সাড়ম্বরে লিখলো আকাশ নীল রঙা সে খাতায়
খুশির ছন্দে মেঘগুলো সব ভাসলো নিজের মত
হারিয়ে যাওয়া এই তো সময় আবীরে উদ্ধত।
আহ্লাদে সব রঙের বাহার অপরাজিতা হাসি—
অশোক পলাশ বকুল ফাগে রঙেতে বানভাসি
এর মানে এক প্রাণের টানে ফাগুন জাগা দিনে
ছড়িয়ে সে রঙ মাতল ভুবন মউল ফোটা বীণে।
আকাশ বাতাস মুখর হয়ে বর্ণে ভেসে থাকে
আলোয় ভালোয় হাস্নুহানা শান্তি পুর সে আঁকে
মনের ঘরে দ্বন্দ্ব মুছে ছোটায় ঝরনাধারা
রঙে–রূপে ছড়িয়ে থাক স্বর্ণ মুকুল পাড়া।
সবার রঙে সবাই রাঙা মর্ম–সহচরী
আঁকন–বাঁকন সুরের কাঁকন ছড়িয়ে সেদিক ভরি
আকাশ বাতাস রঙের তিতাস নদীর ঢেউ তুলুক
আবীর মাখা ভুবন আঁকা মনের মাঝে দুলুক।
বসন্ত এসে গ্যাছে
দুর্গাদাস মিদ্যা
দুজনে বসে ছিলাম ছাদে হাতে হাত রেখে
হঠাৎ কুহু কুহু ডাকে শক্ত হল দুটো হাত।
ঝন্ ঝন্ করে উঠল বুঝি মন গভীর আকর্ষণ
জমা হল দুচোখে।
নীচে এসে দেখি রঙ্গন আর পলাশ লুটোপুটি খাচ্ছে উঠোনে।
বৌঠান তাই তেরচা চোখে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে বেশ মোহময়।
মন যাই যাই করে। উড়ু উড়ু মন জানি না কোন কাঞ্চন চায়!
হাতে বাঁশি নেই তবু গোপন সুর খেলা করে আমার ধমনীতে।
বানজারা বুকে বেদুইন বসন্ত
অভিজিৎ সাহা
এই নশ্বর শরীরে শান্তি নিকেতন
ফি বছর হয় ফাগ ফাগুন হেমন্ত
এখানে জনম এ মাটিতেই মরণ
জীবন তো দাঁড়ি কমা আর হসন্ত
পলাশফুল প্রাণে কৃষ্ণচূড়া দোল
বানজারা বুকে বয় বেদুইন বসন্ত
বসন্ত বিলাস
দীপঙ্কর সরকার
এখন বসন্তকাল প্রেমের মরশুম
হৃদয়ে বৃষ্টি অঝোর কামনার ফুল
কোকিল ডেকেছে কবেই গাছে
গাছে আম্র মকুল।
বাতাসে ছড়ায় গন্ধ
বনে বনে লাগে দোল
পাতায় পাতায় কাঁপন
নদীও বদলায় ভোল।
কৃষ্ণচূড়া লালে লাল
দিগন্তে ফাগুয়া রং
আলোয় ভরা উঠান
ঋতুরাজ সেজেছে সঙ।
এমন দিনে উচাটন
মন, বড্ড বেভুল
ঠিকানা হারিয়ে খোঁজে
শেষ পারানির কূল।
দোল ফাগুনের সুখে
সুব্রত চৌধুরী
রংয়ের ছোঁয়ায় তনুমনে
প্রেম সোহাগের আগুন জ্বেলে,
স্বপ্নাবেশে ঘুরে বেড়াও
মনময়ূরীর ডানা মেলে।
রংয়ের শ্রাবণ বৃষ্টি হয়ে
ঝরে তোমার সিল্কি চুলে,
হোলি খেলায় রংয়ের দোলায়
মনটা তোমার খুশে দোলে।
রংয়ের ছোঁয়া পেয়ে তুমি
হও যে ভীষণ আত্মহারা,
তটিনীর মতো ছুটে চলো
মনটা তোমার পাগলপারা।
তোমার মনে ফাগের ছোঁয়া
রং মেখেছো মিষ্টি মুখে,
রংযের খেলায় মেতে ওঠো
দোল ফাগুনের রঙিন সুখে।
খেলবো হোলি
সুজন দাশ
রং লাগে না কৌটো ভরা
রং থাকা চাই মনে,
এসো সখি খেলবো হোলি
আজকে নিধুবনে।
ওই যে দেখো প্রকৃতিতে
রঙের ছড়াছড়ি,
গাইছে খুলে হাজার পাখি
উঠছে যে মন ভরি!
রঙের ভেলায় আজকে চলো
করবো ভাসাভাসি,
রাঙাবে ওই মনটি তোমার
হাঁটবো পাশাপাশি।
আজকে কানু সখির সনে
ঘুরছে ব্রজধামে,
কান পাতলেই শুনবো বাঁশি
পাগল হবো নামে।
দে দোল্ দোল্
মধুসূদন দরিপা
দে দোল্ দোল্ দে দোল্ দোল্
বাঁশিতে মেতেছে যে–হিন্দোল
উথাল পাতাল যমুনার জল
কালা সনে হবে রঙ্ হিল্লোল
দে দোল্ দোল্ দে দোল্ দোল্
চোখ থিরিথিরি অশ্রু বিহ্বল
পুলকিত তনু হিয়া টলমল
উদ্ধত পীন রাধা–নিচোল
দে দোল্ দোল্ দে দোল্ দোল্
ললিতে বিশাখে সখীর দল
ও বড়াঈ আর কে আছে বল্
ডাকছে মরণ ত্বরায় চল্
দে দোল্ দোল্ দে দোল্ দোল্
আবিরে রাঙাবে কানহা পাগল
স্বেদ বেয়াকুল রোমকূপ দল
পরশ–অধীর রাধা কপোল
দে দোল্ দোল্ দে দোল্ দোল্
বেরঙিন পৃথিবী
দেবারতি গুহ সামন্ত
রঙের মেলায় সামিল হতে চেয়েছি বরাবর,
কিন্তু সেই অদৃশ্য প্রাচীরটা বাধা দিয়েছে,
হতে পারে আমি মেয়ে বলে,
হতে পারে আমি একলা বলে,
হতে পারে আমি লক্ষ্মী নই বলে।
কি আর করা, বস্ত্রহরণ হয়েছে অনেক আগেই,
বৃন্দাবন থেকে আসেনি কৃষ্ণ বাঁচাতে আমার সম্মান,
হতে পারে আমি দ্রৌপদী নই বলে,
হতে পারে আমি কৃষ্ণকে সখা পাতাইনি বলে,
হতে পারে আমি চুপ ছিলাম না বলে।
হ্যা, করেছিলাম অন্যায়ের প্রতিবাদ,
যখন ওরা সবাই মিলে রক্তাক্ত করছিল আটের শিশুকে,
ওই বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলাম,
হাতে লেখেছিল টাটকা লাল রঙ,
যেখানে কিলবিল করছিল মেরুদণ্ডহীন সমাজ।।
ফাগুন দিনে
আসাদুজ্জামান খান মুকুল
আসছে ফাগুন লাগছে আগুন
শিমুল পলাশ ডালে,
সখী ছাড়া আমি সারা
এমন ফাগুন কালে!
ফুটিছে ফুল প্রকৃতি কুল
লাল হয়েছে দূরে,
কোকিল ডাকে বিটপশাখে
কুহু কুহু সুরে।
ফুটছে কলি উড়ছে অলি
গুণগুণে গান করে,
বিহার করে ফুলের পরে
দেখি নয়ন ভরে।
দখিনা বায় উতলা হায়
করছে পরানখানি,
এমন ক্ষণে নাই যে সনে
আমার মনের রানি।
আমার প্রিয়া মনটি নিয়া
কোথায় গেলি শেষে?
ভালোবাসা করো খাসা
ফাগুন দিনে এসে!
রঙিন বসন্ত
মালবিকা পণ্ডা
বসন্ত এসে গেছে রং ভরপুর,
কোকিলা উঠিল গেয়ে কন্ঠ সুমধুর।
পলাশ কহিল ডেকে , ‘কোথা ছিলে পিক!’
সহাস্যে কহিল তারে থাকি দিগ্বিদিক।
তরুকোটর বাস্তুভিটে লোক চক্ষুর আড়ালে,
আগুন ঝরা ফাগুনে আসি বসন্ত হাত বাড়ালে।
শূন্য শাখা ভরে যায় নব কিশলয়ে,
তরুরাজি সেজে ওঠে সুরের ছোঁয়া পেয়ে।
লাগলে রং ফাগুন মাসে বসন্তের আহ্বানে,
উড়ে এসে জুড়ে বসি দক্ষিণ বাতায়নে।
শিমুল পলাশ অশোক তরু ছড়ায় আগুন বাতাসে,
জুই চামেলি রাধাচূড়া সব যেন আজ ফ্যাকাশে।
রাই কিশোরী খেলবে হোলি আসবে চিকনকালা,
করবে বরণ হাতে নিয়ে পলাশ ফুলের মালা।
ছাতিম তলায় উদাস বাউল বাজায় একতারা,
দোল উৎসবে শান্তিনিকেতনে সবাই মাতোয়ারা।
ফাগুন এলে
নিবেদিতা দে
ফাগুন এলে বনে বনে মদিরা হাওয়ায়,
মহুয়ার নেশা জাগে,
দ্রিমি দ্রিমি তালে মাদল বাজে,
মনে রঙের দোলা লাগে।
ফাগুন এলে আবীর রঙের উজ্জ্বলতায়,
প্রজাপতি মন আকাশে ডানা মেলে।
ফাগুন এলে কোকিলের কুহুতানে
বৃক্ষশাখে, কচি পাতায়, জলে–স্থলে,
দক্ষিনা হাওয়ায় আনন্দের হিল্লোল ওঠে।
ফাগুন এলে ঋতুরাজ বসন্ত আসে,
শিমুল পলাশে আগুন রঙ লাগে,
প্রকৃতি সাজে নতুন বধু রূপে।
ফাগুন এলে কৃষ্ণচুড়া রাধাচুড়ার আকাশে প্রেম জমে,
ভালোবাসার কচি রোদ ঝলমল করে তোমার আমার চোখে মুখে।
বসন্ত ধরা পড়ছে পটুয়ার রঙ তুলিতে
ইলিয়াছ হোসেন
বাংলার দুয়ারে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত
কৃষ্ণচূড়া পলাশের ডালে বসেছে রঙের মেলা
বুড়ো পাতা ঝরে পড়ছে নীরবে
নবজাতক পাতা হরষে জানান দিচ্ছে
তার আগমনি বার্তা,
বসন্তে হাঁড় কাঁপানো শীত হয়েছে দূর
দখিনের মৃদু হাওয়া লাগছে বড্ড মধুর।
আম্রমুকুলে মধুকরের গুঞ্জন হৃদয় করছে হরণ
কোকিলের কুহুরবে মুখরিত চারদিক
নানান সাজে শোভিত বসন্ত ধরা পড়ছে পটুয়ার
রং তুলিতে।
আজ
শীতল চট্টোপাধ্যায়
দখিনের প্রথম হাওয়া আজ
বসন্ত হাওয়ায়।
কোকিলের প্রথম ডাকা আজ
বসন্ত বাহারে।
পলাশের প্রথম কুঁড়িটির আজ
ফুটে ওঠা।
বাতাস হারমোনিয়ামের
স্কেল চেঞ্জ হওয়া মুখরা আজ।
মনে–মন বদলের গুনগুনানোয়
রাঙা মুখের ছোঁয়া আজ কৃষ্ণচূড়ার।
অলঙ্কার নেই মেয়েয় আজ
প্রেমিকার সাজ,
অনুচ্চার ছুঁয়ে ছেলেটিও প্রেমিক আজ।
মধু ঋতুর জাদুতে আজ
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
নীল আকাশে লাল পাপড়ির বুনটে রঙ্গোলী,
পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়া মাদার খেলে হোলি।
পালিয়ে যেতে ইচ্ছে ছিল পুরুলিয়ার পথে,
পাঁচমুড়ি পাহাড়ে না হয় সহেলীদের সাথে।
কে তুমি গো বাজিয়ে বাঁশি দোল লাগালে চিতে?
ধরল কাঁপন শিরশিরানি কন্যাকালের ভিতে।
অন্তবিহীন মন্ত্র যেন মত্ত মনের বীণে
গুনগুনিয়ে গুচ্ছ স্বপন ওড়াচ্ছে ফিনফিনে।
লাল শালুকে সর ফেলেছে কালো ঝিলের বুকে,
কোকিল সখার স্বরলিপি মৌটুসি নেয় টুকে,
ফাগুন জুড়ে বাঁশির সুরে কালার কথাই ভাসে,
না চেনা ও পথিক বুঝি ফিরেছো পরবাসে!
মনের দ্বারে দাঁড়াও এসে, আবির মাখাই প্রাণে,
মধু ঋতুর জাদু কথন শোনাই কানে কানে।
সব ছবি: আন্তর্জাল
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments