শহরের গর্বের স্মৃতিসৌধ
ভুলছে উদাসিন বাঙালি
সৌভিক সিনহা
ইতিহাস হাতড়ালে দেখা যাবে, কত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই শহর। কলকাতার বুকে প্রথম বাঙালি রেজিমেন্টের সদস্যদের শ্রদ্ধা জানাতে তৈরি করা হয়েছিল একটি স্মৃতিসৌধ। ৫৬ জন বাঙালি যুবকের নাম জ্বলজ্বল করছে ওই স্মৃতিফলকে। জানেন এটি কোথায়? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো দিকে, কলেজ স্কোয়্যারে। সাদা ধবধবে মার্বেল তৈরি স্মৃতিসৌধটি মানুষের মধ্যে থেকেও রয়ে গেছে অগোচরে। সকাল–বিকাল কত মানুষের আনাগোনা। তবুও একবার ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় স্মৃতিটুকু ছুঁয়ে দেখার সময় নেই। চলতি বছরে আগস্টে স্মৃতিসৌধ স্থাপনে ৯৯ বছর পূর্ণ হবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ঘিরে গোটা দুনিয়া যখন তোলপাড়, সেই আঁচ গিয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ডের বাকিংহাম প্যালেসে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হাওয়ায় তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ সরকার সেনাবাহিনীতে আরও লোক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯১৬ সালে ৭ আগস্ট ঢাকায় লেজিসলেটিভ কাউন্সিলর গভর্নর লর্ড কারমাইকেল বাঙালি পল্টন গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। প্রথম একটি কোম্পানি এবং তারপর সেটি নিয়মিত রেজিমেন্ট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল ইংরেজ সরকার। এক সময় বাঙালিদের সরাসরি সেনায় যোগদান করার পক্ষপাতী ছিল না ব্রিটিশ প্রশাসন। ইংরেজরা সেই ভাবনা নিজেদের প্রয়োজনে বদলায়। এরপর থেকে সৈনিক জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য অনেক উচ্চশিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের বাঙালি যুবক সাধারণ সৈনিক হিসেবে পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ্ বাহাদুর এবং কুমার অধিক্রম মজুমদার, মোহিতকুমার মুন্সির নাম যেমন আছে, পাশাপাশি আছে বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রণদাপ্রসাদ সাহা, নিত্যগোপাল ভট্টাচার্য, মনবাহাদুর সিংহ এবং বিশিষ্ট যাত্রাভিনেতা সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের নাম।
স্মৃতিসৌধ। কলেজ স্কোয়্যার। কলকাতা। ছবি: লেখক
ওই ইউনিটকে করাচিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। এরপর চলে প্রশিক্ষণের পালা। বেঙ্গল রেজিমেন্টকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে ১৯১৭ সালে মেসোপটেমিয়ান যুদ্ধে পাঠানো হয়। ওখানে বেশ কয়েকজন রেজিমেন্ট সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই অবস্থাতেই গোটা ইউনিট ওখান থেকে বর্তমান ইরাকের বাগদাদে পৌঁছোয় সেপ্টম্বরে। কিন্তু এতেও সদস্যদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। অসুস্থতার কারণে বেশ কয়েকজন বাঙালি সৈনিকের মৃত্যু হয় বাগদাদে। এরপর যুদ্ধের জন্য আজিজা, আল কুতে পাঠানো হয় রেজিমেন্টকে। বাঙালি সদস্যরা ক্যাম্পের সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯১৮–এর ১১ নভেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণার পর বাঙালি সৈনিকরা পুনর্বাসন কাজের দায়িত্ব সামলেছেন। এরপর কুর্দিস্থান অভিযানে ওই ইউনিট অংশ নিয়েছিল। ১৯২০–তে কলকাতায় ফেরে রেজিমেন্ট। কিন্তু বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ওই বছরেই রেজিমেন্ট ভেঙে দেয় ব্রিটিশ প্রশাসন।
বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রথম বাঙালিদের আধুনিক সামরিক রেজিমেন্ট। ওই পল্টনে প্রায় ৬ হাজারের বেশি সদস্য নিয়েছিল তৎকালিন ব্রিটিশ সরকার। এক–একটি কোম্পানিতে ২২৮ জন সদস্য রাখা হয়েছিল। ওই রেজিমেন্টের ৫৬ জন সদস্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান, বরিশাল, ঢাকা, মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, খুলনা, যশোর–সহ বাংলার বাইরে–থাকা অনেক বাঙালি যুবকেরা যোগদান করেছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে। তাঁদের স্মৃতিতে কলেজ স্কোয়্যারে ১৯২৪–এর আগষ্টে তৈরি করা হয় স্মৃতিসৌধ। তবুও উদাসীন থেকে যায় বাঙালি চিত্তে। এটি একটি মার্বেল পাথরের তৈরি স্মৃতিসৌধ নয়। বাঙালিদের গর্বের আরও এক স্মরণীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কলকাতার বুকে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments