সম্ভবত ৬–৭ মিলিয়ন বছর আগে মানুষের সৃষ্টি, আর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের অনুভূতিগুলো একে একে প্রকাশ পেতে থাকে। তারই মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিয়ে রয়েছে ব্যথা। খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে পায়ে কিংবা হাঁটুতে ব্যথা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে মারামারিতে চোট লাগা কিংবা অন্য কোনও কারণে আঘাত লাগা—যাই হোক না কেন এর উৎপত্তি কিন্তু বহু বছর আগেই।
পুরনো দিনের বিভিন্ন পুঁথিপত্র ঘেঁটে জানা যায় শরীরের ব্যথা কমানোর জন্য বিভিন্ন ওষুধ গাছগাছড়া বা জড়িবুটি থেকে তৈরি হত। পিরামিডের যুগেও পেট এবং শরীরের অন্যান্য অংশের ব্যথার চিকিৎসার নানা খবরা খবর পাওয়া যায়। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি অ্যালোপ্যাথি বিজ্ঞানে ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে সফলতা আসে ১৭৬৪ সালের পরে, যে সময় এডওয়ার্ড স্টোন উইলো গাছের ছাল থেকে ম্যালেরিয়ার ওষুধ আবিষ্কার করেন। এই স্যালিসাইলিক অ্যাসিডই সারা পৃথিবী জুড়ে ব্যবহার করা হয় ব্যথা কমানোর জন্য। এ জন্য জার্মান জনৈক কেমিস্ট সর্বপ্রথম অ্যাসপিরিন ওষুধের ব্যবহার করেন। আর এখনকার সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য ওষুধ হল NSAIDs, যা কিনা এল ১৯৭০–৮০–র মধ্যে।
এই NSAIDs–এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি রিউম্যাটয়েড আর্থারাইটিস এবং অস্টিও–আর্থারাইটিসে। এই ওষুধ যদি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ব্যবহার করা হয় তাহলে জয়েন্টের বিভিন্ন রোগে বিশেষ উপকার মেলে।
ব্যথার ওষুধে ক্ষতি
প্রথম ও প্রধান ক্ষতি হল এই ওষুধগুলো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিন্যাল ট্রাক্টের মিউকোসায় (ঝিল্লিতে) ইরোসন, আলসার, ব্লিডিং, স্ট্রিকচার এবং পারফোরেশন করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এসব ওষুধ লিভারের ইনজুরি করে হেপাটাইটিস ঘটাতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের ক্ষতি করে প্যাংক্ৰিয়াটাইটিস বাধাতে পারে। কিডনির ক্ষেত্রে ক্ষতিটা আরও মারাত্মক। হঠাৎ করে রোগীর রেনাল ফেলিওর হতে পারে।
কীভাবে পেটের ক্ষতি করে
এরা সরাসরি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল ট্রাক্টে মিউকোসার স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জিআই মিউকোসার সেলের মধ্যে থাকা সাইক্লোঅক্সিজিনেস এনজাইমকে প্রভাবিত করে প্রস্টাগ্লান্ডিন তৈরি বন্ধ করে দেয়। ফলে জিআই মিউকোসার রক্ত সঞ্চালনে গন্ডগোল, মিউকোসার ক্ষত ইত্যাদি তৈরি হয়।
কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন
প্রথমত, বেশি বয়সের মানুষেরা—এদের বিভিন্ন ধরনের রোগ লেগেই থাকে। এই বয়সে জয়েন্টে ব্যথাও বাড়ে, তার জন্য ওষুধও বেশি খান। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাও এই বয়সে কমে যায় আর এর ফলে ক্ষতি আরও বেশি হয়।
দ্বিতীয়ত, মহিলারা—মহিলাদের বিভিন্ন সন্ধিস্থলে ব্যথা–বেদনা বেশি হয়। মাথাব্যথা এবং পিরিয়ডের সময় ব্যথা বেশি হয় বলে ব্যথার ওষুধ সেবনের পরিমাণও বেড়ে যায়। যার ফলে ক্ষতির পরিমাণও বাড়ে।
তৃতীয়ত, হাই বা মাল্টিপল ডোজেজ অফ NSAIDs, অনেকেই আছেন কোনও কারণ ছাড়াই মুড়ি–মুড়কির মতো ব্যথার ওষুধ খান—যা কিনা খুবই সহজলভ্য।
চতুর্থত, যাঁর আগে থেকেই পেপটিক আলসারের রোগ আছে, তাঁর ব্যথার ওষুধ খেলে এই আলসার আরও বেড়ে যায়। এর ফলে অনেক সময় ব্লিডিং পর্যন্ত হয়।
পঞ্চমত, যাঁদের ব্যথার ওষুধ খাওয়ার পরে আলসার হওয়ার পুরােনা ইতিহাস আছে তাঁদের এই ব্যথার ওষুধ খেয়েও আরও বেড়ে যায় আলসার।
ষষ্ঠত, যাঁরা অন্য কোনও কারণে স্টেরয়েড খাচ্ছেন কিংবা অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট ওষুধ খাচ্ছেন তাঁরা একই সঙ্গে ব্যথার ওষুধ খেলে আলসার হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
সপ্তমত, এছাড়া যাঁরা ধূমপান, মদ্যপান করেন তাঁরা যদি ব্যথার ওষুধ খান, তাহলে তাঁদের আলসার হয়ে থাকলে তা আরও বেড়ে যায়।
অষ্টমত, যাঁদের পাকস্থলিতে এইচ পাইলোরি ব্যাক্টেরিয়া বাসা বাঁধে তাঁদের ব্যথার ওষুধ খেলে পরিণাম হয় মারাত্মক।
কোন ওযুধে কতটা বিপদ
সাধারণ জ্বরের ওষুধ প্যারাসিটামলও ব্যথা কমায়। কিন্তু হালকা ব্যথায় কাজ করে। তবে এটা খেলে পেটের অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা তেমন থাকে না। NSAIDs গ্রুপের মধ্যে যে ওষুধ সবচেয়ে কম আলসারের কষ্ট দেয় তা হল আইবুপ্রফেন এবং DICLOFENAC। এই দুটো ওষুধ খেলেও ক্ষতির মাত্রা তেমন নয়। সরাসরি ক্ষতি করে INDOMETHACIN। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে KETOPROFEN। কয়েক বছর আগে কিছু ব্যথার ওষুধ বাজারে এসেছিল যেটা পাকস্থলির খুব কম ক্ষতি করে। অর্থাৎ আইবুপ্রফেনের থেকেও ভালো মনে করা হতো। কিন্তু কিছু ওষুধ খাওয়ার ফলে দেখা গেল হার্টের ক্ষতি হচ্ছে, তাই সারা পৃথিবীতে এদের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং সমস্যাটা কোথায় জানতে পারলেন এবং বুঝতেও পারলেন, তাই ওষুধ কিনুন অবশ্যই ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনে।
কতদিন পরে ক্ষতি
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় এক থেকে তিন মাসের মধ্যে। তবে যতদিন ওষুধ খাবেন ততদিন ক্ষতিটা চলতেই থাকবে। ১০ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর পাকস্থলির হালকা ক্ষতি হলেও দু থেকে চার শতাংশ রোগীর বড়সড় জটিলতা যেমন আলসার, রক্তপাত, পারফোরেশন হতে পারে। এবার আসি যাঁদের হার্টে ইস্কিমিয়া। হার্টের ইস্কিমিয়া প্রতিরােধ যে ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয় তাদের নাম অ্যাসপিরিন এবং ক্লোপিডোগ্রেল। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে অ্যাসপিরিন প্রয়োগে করলে হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কের অসুখ থেকে দূরে রাখা যায় রোগীকে। কারণ এর ফলে রক্ত জমাট বাঁধে না। এটা বিজ্ঞানের একটি দিগন্তকারী আবিষ্কার, যা সত্যিই প্রশংসনীয়। দুর্ভাগ্যবশত এই অ্যাসপিরিন এবং ক্লোপিডোগ্রেলের জন্য আলসার রোগীর পেটে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই যাঁদের হার্টের জন্য অ্যাসপিরিন খেতেই হয় তাঁদের পেটকে রক্ষা করার জন্য কিছু ওষুধও খেতেই হবে।
কোথায় কী ক্ষতি হয়
ইসোফেগাসের আলসার এবং স্ট্রিকচার হতে পারে। পাকস্থলিরও ইরোসান, আলসার, গ্যাস্ট্রোপ্যাথি হতে পারে। এর ফলে রোগীর খিদে কমে যায়। পেট ভার হয়ে থাকে। গা বমি বমি ভাব হয়। পেটে ব্যথা হয় আর এর সঙ্গে মিউকোসা থেকে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণও হতে পারে। আবার রোগীর শরীরে রক্তের অভাব অথবা রক্তল্পতাও দেখা দেয়। অনেক সময় এতই রক্তক্ষরণ হতে থাকে যে প্রাণ সংশয় পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। পাকস্থলি ফুটোও হয়ে যায়।
অনেক সময় ক্ষুদ্রান্ত্রেও একই রকমের ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে যেটা হতে পারে সেটা হল হজমে ব্যাঘাত। যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে ম্যালঅ্যাবসর্পশন বা বদহজম। এর ফলে রোগীর ওজন কমে যায়। অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা দেখা দেয়। পা ফোলে। পেটে জল জমে।
বৃহদন্ত্রেও আলসার, স্ট্রিকচার, ডায়াফ্রাম এবং পারফোরেশন হতে পারে। আবার পুরো কোলনে ঘা হতে পারে। আর আগেই বলেছি লিভারে হেপাটাইটিস হতে পারে।
হলে কী করব
সময়ের অপেক্ষা না করে রোগটাকে না বাড়তে দিয়ে নিকটবর্তী ডাক্তারবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ব্যথার ওষুধ বন্ধ। সাধারণ অ্যান্টাসিড এবং র্যানিটিডিন জাতীয় ওষুধ বেশির ভাগ সময়ই কাজ করে না। যেসব রোগীদের ব্যথার ওষুধ খেতেই হবে তাঁরা নিয়মিত প্রোটোন পাম্প ইনহিবিটর (Proton Pump Inhibitor) খাবেন।
অনেক সময় ব্লিডিংয়ের জন্য রক্ত নিতে হয়। আবার রক্তপাত বন্ধ করতে এন্ডোস্কোপির সাহায্য নিতে হয়। স্ট্রিকচার এবং পারফোরেশনের ক্ষেত্রে অপারেশন জরুরি।
তাহলে বাঁচার উপায়
প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে পুরনো অর্থাৎ মান্ধাতা আমলের ধ্যান–ধারণার আমূল পরিবর্তন। সহজলভ্য স্টেশনারি দোকান থেকে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ ছাড়া ব্যথার ওষুধ না কেনা। আবার ব্যথা কমছে না বলে অনেক ধরনের ব্যথার ওষুধ এক সঙ্গে খাওয়াও একেবারেই চলবে না। ধূমপান ও মদ্যপান একেবারেই বন্ধ, যদি বাঁচতে চান।
খালিপেটে ব্যথার ওষুধ না খাওয়াই ভালো। ব্যথার ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে আমরা অ্যান্টাসিড জাতীয় যেসব ওষুধ খাই সেগুলোর তেমন কোনও প্রতিরােধ ক্ষমতা নেই। পেটের ব্যথা কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নিয়ে তবেই ব্যথার ওষুধ খেতে হবে।
যখন মানব–মানবীর জন্ম তখন থেকেই পেট সঙ্গে ছিল অর্থাৎ ৬ মিলিয়ন বছর আগে থেকে পেট আমাদের দেহের সঙ্গী। আর ব্যথার ওষুধের জন্ম মাত্র ২৬০ বছর। তাই পেটও থাকবে পেটের ব্যথাও থাকবে। সেই ব্যথাকে কমাতে হবে বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনেই।
(মতামত একান্ত ব্যক্তিগত)
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *
Comments